নির্বাচিত কলাম

স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের জন্য দ্বীন ইসলাম চর্চার সহজ পন্থা

 

যে সমস্ত মুসলিম ভাই ও বোনেরা দ্বীনি মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেন তাদের জন্য দ্বীনের ওপর চলা অনেকটাই সহজ হয়। কিন্তু মুসলিম সমাজের অধিকাংশ ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজ ভার্সিটিতে পড়ালেখা করেন। ওখানকার সিলেবাস যেহেতু সেকুলার সিস্টেমে সাজানো, ফলে ইসলামিক শিক্ষা সেখানে অবহেলিত। বরং ঈমান-আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক অনেক থিওরি মতবাদ ও টপিকস রয়েছে সেই শিক্ষা কারিকুলামে।

আবার সহশিক্ষা ও নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে শিক্ষার্থীদের দিনদিন আমল আখলাক ও চরিত্রের সীমাহীন অবক্ষয় ঘটছে। মুসলিম হিসেবে যা যা করণীয় ও বর্জনীয় ছিল, সেগুলোর তোয়াক্কা না করে মূল্যবান জীবন অপাত্রে অতিবাহিত করছে একেকজন শিক্ষার্থী। বাহ্যিক দৃষ্টিতে দুনিয়াতে সফল হলেও বরবাদ করে দিচ্ছে তাদের আখেরাত। অথচ প্রত্যেক নর-নারী আল্লাহর কাছে সমান। সবাইকে আল্লাহর কাছে তাদের আমল সম্পর্কে জবাবদিহিতা করতে হবে।

“প্রতিষ্ঠান পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে আল্লাহর হুকুম মানতে পারি নি “এরকম কোন অপারগতা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য দ্বীনের ওপর চলা অনেকটা সহজ হলেও, স্কুল কলেজ ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের জন্য তা খুবই কঠিন। প্রতিকূল পরিবেশে থেকে সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে দ্বীনের উপর চলতে হয়।

প্রবন্ধটিতে আমরা স্কুল কলেজ ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের জন্য দ্বীনের ওপর চলার জন্য সহজ কিছু টিপস বলে দেয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ

১, প্রত্যেকটি ছেলে-মেয়ে তার ছোটবেলায় মসজিদে অথবা মক্তবে কুরআন শিখে নিবেন।
বিশুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে না পারলে অবশ্যই কোন একজন আলেম সাহেব থেকে বিশুদ্ধভাবে কুরআন শিখে নিবেন।
২, ইসলামের মৌলিক আকিদা তথা তাওহীদ রিসালাত ও আখিরাত৷ ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত বিধানগুলো শিখে নিবেন।
৩, বিশুদ্ধভাবে নামায আদায়ের পদ্ধতি শিখে নিবেন এবং নামাজের জন্য কয়েকটি সূরা মুখস্ত করবেন।
৪, শিক্ষার্থীরা পাঁচ ওয়াক্ত সালাত অবশ্যই আদায় করবেন। ছেলেরা জামাতের সাথে ও মেয়েরা ওয়াক্তমত সালাত আদায় করবেন।
৫, হক্কানী আলেম-ওলামাদের সাথে সম্পর্ক রাখবেন। তাদের সুহবতে মাঝেমধ্যে সময় দিবেন। এবং মেয়েরা পরিচিত আলিমা ও দ্বীনদার মহিলাদের সাথে যোগাযোগ রাখবেন।
৬, দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সময় দিবেন।
৭, একজন হক্কানী বুজুর্গ আলেমকে নিজের ইসলাহী মুরুব্বী হিসেবে মেনে নিবেন এবং তার পরামর্শে যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
৮, একাডেমিক পড়ালেখায় খুব মনোযোগ দিবেন অযথা সময় নষ্ট করবেন না।
৯, পড়ালেখার জন্য নিয়ত সহিহ করে নিবেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি, ইসলামের খেদমত ও জনসেবার নিয়তে পড়ালেখা করবেন।
১০, একাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি আপনার মুরব্বি আলেম সাহেবের পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানে দ্বীনি কিছু বই-পুস্তক প্রতিদিন অধ্যয়ন করবেন। বিশেষভাবে —
দৈনন্দিন জীবনের মাসআলা মাসায়েল বিষয়ক বই, মৌলিক আকিদা বিষয়ক বই, নবীজির সিরাত ,সাহাবায়ে কেরামের জীবনী, মুসলিম মনীষীদের জীবনী, প্রত্যেক আমলে নবীজির সুন্নত পদ্ধতি বিষয়ক বই,ফাজায়েলের বই, ইত্যাদি নিয়মিত অধ্যয়ন করবেন।

১১, অনলাইন থেকে দ্বীন শিক্ষার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকবেন। আপনার মুরব্বি আলেম সাহেবের পরামর্শে সঠিক ব্যক্তি, সঠিক লিংক ও সাইট নির্বাচন করে সেখান থেকে দ্বীন গ্রহণ করবেন। কারণ অনলাইনে বিভ্রান্তিকর উপকরণ বেশি।
১২, প্রয়োজনে নামাজের ইমামতি করার জন্য, আপনজনের জানাজা পড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত যোগ্যতা অর্জন করবেন।
১৩, ছেলেরা অবশ্যই দাড়ি রাখবেন। মেয়েরা পর্দা করে চলবেন।
১৪,তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বেন। অবশ্যই ফজরের নামাজের ওয়াক্ত মত জামাতের সাথে আদায় করবেন।
১৫, মা-বাবার খেদমত করবেন। তাদেরকে শ্রদ্ধা করবেন। ছোট-বড় সবার সাথে উত্তম আচরণ করবেন।
১৬, হক ও বাতিল পরিচয় করবেন এবং মরণ পর্যন্ত হক জামাতের সাথে থাকবেন। বিশেষভাবে স্কুল কলেজ ভার্সিটিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন দল সংগঠন ও মতবাদ এর দাওয়াত পৌঁছবে আপনার কাছে। এই ক্ষেত্রে মুরুব্বী আলেম সাহেবের পরামর্শ নিবেন।
১৭, হালাল ও হারামের জ্ঞান অর্জন করে তা মেনে চলবেন। অন্তত হারামকে হারাম এবং হালালকে হালাল মনে করবেন।
১৮, এলাকার দ্বীনি মাদ্রাসায় আসা যাওয়া করবেন। সাধ্যানুযায়ী সহযোগিতা করবেন।
২০, ক্লাসমিটদের মধ্যে দাওয়াতি কাজ করবেন।

বর্জনীয় কিছু কাজ —
১৭, মন্দ সংশ্রব।
১৮, সহশিক্ষা।
কারণ, সহশিক্ষা ইসলাম সাপোর্ট করেনা। তাছাড়া সহশিক্ষা অনেকগুলো ফিতনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়৷ তাই ছেলেরা ছেলেদের প্রতিষ্ঠানে মেয়েরা মেয়েদের প্রতিষ্ঠানে আলাদা আলাদাভাবে পড়বেন। যদি কেউ বাধ্য হয়ে বা অসতর্কতার কারণে সহশিক্ষার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েই যান, তাহলে ইসলামের ফরজ বিধান “শরয়ী পর্দা” অবশ্যই মেনে চলতে হবে। নজরের হেফাজত করতে হবে। বেগানা ছেলে-মেয়ে কখনো একত্র হবেন না। তবে আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে এই পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার৷

১৯, ইসলাম বিরোধী যে সব টপিকস আপনার পাঠ্যসূচিতে পড়ানো হবে, তার দ্বারা বিভ্রান্ত না হয়ে আলেম সাহেব থেকে সঠিক বিষয়টি জেনে নিবেন। নিজের ঈমানের হেফাজত করবেন৷
২০, মোবাইল ব্যবহার না করাটাই ভালো। একান্ত প্রয়োজনে ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে বিয়ের আগ পর্যন্ত এন্ড্রয়েড সেট ব্যবহার করবেন না। কেউ যদি এন্ড্রয়েড ব্যবহার করেই থাকেন তাহলে মিস ইউজ করবেন না। অশ্লীল ছবি ভিডিও দেখবেন না। জীবন বিধ্বংসী নানা ধরনের গেইমে লিপ্ত হবেন না। মোবাইলে অযথা সময় নষ্ট করবেন না৷ রুটিন করে অল্প সময় মোবাইল ব্যবহার করবেন। রাতে ঘুমানোর সময় মোবাইল অভিভাবকের কাছে জমা দিয়ে দিবেন।
২১, আলেমদের প্রতি অন্তরের বিদ্বেষ রাখবেন না। আলেমদের সাথে কোন ধরনের বেয়াদবিমূলক আচরণ করে নিজের আখেরাত বরবাদ করবেন না।
২২, কাবিরাহ সাগিরাহ সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবেন। বিশেষভাবে হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার, গালাগালি-মারামারি, গীবত- চোগলখুরী, যিনা-ব্যভিচার এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাকবেন। যৌবনকে অবৈধ পন্থায় ক্ষয় করবেন না।
২৩, টিভি, সিনেমা, গান-বাজনা, অশ্লীল ছবি ও ভিডিও থেকে বেঁচে থাকবেন।
২৪, নিয়মিত ব্যায়াম ও শরীরচর্চা করবেন। তবে অযথা খেলাধুলায় সময় নষ্ট করবেন না। কারণ, খেলাধুলা ইসলামে নিষিদ্ধ। বিশেষভাবে জুয়া মিশ্রিত শরীয়তবিরোধী খেলাধুলা থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাকবেন।
২৫, দ্বীনহীন পরিবেশে পড়ালেখা করায় সবসময়ই গুনাহ হচ্ছে। এজন্য সর্বদা তাওবা ইস্তেগফার করতে থাকবেন। আল্লাহর কাছে হেদায়েতের জন্য দোয়া চালিয়ে যাবেন।
২৫, ধুমপান ও নেশা জাতীয় দ্রব্য থেকে বেঁচে থাকবেন।

* সকল শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় হলো —
*ইসলামের উপর চলার মানসিকতা তৈরি করা।
*বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা।
* কবর-হাশর,জান্নাত- জাহান্নাম তথা পরকালের কথা বেশি বেশি স্মরণ করা।
*সর্বদা আল্লাহর কথা স্মরণ করা। আল্লাহর ভয় হৃদয়ে লালন করা।

এ পর্যন্ত যা বলা হলো,এগুলো ছেলে মেয়ে সবার জন্য প্রয়োজন।
** এবার মেয়েদের জন্য বিশেষ কিছু কথা —
প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর দ্বীনহীন পরিবেশে সহশিক্ষার পদ্ধতিতে ছেলেমেয়েদের সংমিশ্রণে একা একা বাহিরে গিয়ে, উচ্চতর পড়াশোনা করার জন্য আমরা আপনাকে পরামর্শ দিব না, উৎসাহিত করবো না।
এরপরেও যদি কোন বোন স্কুল কলেজ ভার্সিটিতে পড়ালেখা করতে চান তাদের জন্য কিছু পরামর্শ —
২৬, পড়ালেখার জন্য গার্লস স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি নির্বাচনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
২৭, ইসলামের ফরজ বিধান “শরয়ী পর্দা” অবশ্যই মেনে চলবেন। শরয়ী বোরকা পরিধান করবেন। পর্দার বিধান ও ইসলামী হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জরুরি জ্ঞান অর্জন করবেন।
২৮, পরিপূর্ণ হায়া ও লজ্জাশীলতা ফলো করবেন।
২৮, বেগানা পুরুষের সংশ্রব থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাকবেন।
২৯, এমনকি খারাপ চরিত্রের মেয়েদের সংশ্রব থেকেও বেঁচে থাকবেন।
৩০, মাহরামকে সাথে নিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করবেন। দিনে দিনে ঘরে ফিরবেন।
৩১, মা বাবার তত্ত্বাবধানে নিজের ঘরে থেকে পড়া লেখা করবেন। পরিবার থেকে দূরে গিয়ে, অনিরাপদ পরিবেশে হোস্টেলে থাকবেন না।
৩২ , আপনার সার্বক্ষণিক ব্যক্তিগত অবস্থা মা-বাবাকে শেয়ার করবেন। মা বাবার পরামর্শ মেনে চলবেন। তাদেরকে উপেক্ষা করে কিছুই করতে যাবেন না।
৩২, পাক-নাপাক ইত্যাদি কিছু মেয়েলি বিধি বিধান রয়েছে, কোন দ্বীনদার আলেমা মেয়ে থেকে অথবা ভালো বই পুস্তক থেকে সেগুলো জেনে নিন।
৩৩, পড়ালেখার পাশাপাশি ঘরের কাজগুলো সঠিকভাবে চালিয়ে যান। বিশেষভাবে স্বামীর সংসার পরিচালনা বিষয়ক ইসলামিক বিধিবিধানগুলো জানার চেষ্টা করবেন।
৩৪, সব সময় ইসলামী বইপুস্তক অধ্যায়নে রাখবেন। এবং প্রতিদিন ঘরে কিতাবি তালীমের ব্যবস্থা করবেন।

**সর্বশেষ স্কুল কলেজের সম্মানিত শিক্ষক মন্ডলীর প্রতি একটি নিবেদন-
আমরা জানি, স্কুল কলেজ ভার্সিটিতে ইসলাম শিক্ষা খুবই অবহেলিত, পক্ষান্তরে সেখানে সেকুলার ও নাস্তিক্যবাদের খুবই সয়লাব।
এ জন্য সম্মানিত মুসলিম শিক্ষক ও শিক্ষিকা মহোদয়! আপনারা নিজ জিম্মায় ছাত্র-ছাত্রীদেরকে দ্বীন ইসলাম চর্চার প্রতি উৎসাহিত করবেন। নিজেও পূর্ণাঙ্গভাবে দ্বীন চর্চা করবেন।
সাবজেক্ট গুলো ইসলামিক না হলেও পাঠদানের পাশাপাশি মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ধর্মচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে পারেন।

** আর সম্মানিত অভিভাবকদের প্রতি নিবেদন —
আপনার সন্তানের আখলাক ও চরিত্রের প্রতি গভীর সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন।আপনার সন্তানের আখেরাত নিয়ে সবচে বেশি ফিকির করবেন।
আপনার সন্তান আখেরাতের জন্য কতটুকু প্রস্তুত আছে? জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পারবে তো!

আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন

সম্পর্কিত পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button