জাগতিক মোহ ও তার প্রতিকার

0

প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম। কেউ যদি বুঝতে পারে, তার ঈমান দূর্বল হয়ে যাচ্ছে, দুনিয়াবি জিনিসের প্রতি আসক্তি বেড়ে যাচ্ছে ; তাহলে তার কি করা উচিত হবে?

উত্তর প্রদানে: মুফতি জিয়াউর রহমান
ইসলামিক ফিকহ ইনস্টিটিউট, সিলেট

ওয়ালাইকুমুস সালাম৷ ঈমান মযবুত হওয়ার নিমিত্তে প্রথমে আমার জন্যে এরপর সবার উদ্দেশ্যে কিছু দিক-নির্দেশনামূলক পরামর্শ দিচ্ছি৷ ঈমানকে শক্তিশালী করার লক্ষে প্রত্যেক মু’মিনেরই এই বিষয়গুলোর উপর আমল করা উচিত৷

১- নেক ও সালিহীন উলামায়ে কেরামের মজলিসে বসা, তাদের যবান থেকে দ্বীন ও শরীয়তের আলোচনা শোনা৷ তাঁদের সোহবত ও সান্নিধ্যে থাকা৷ তাঁদের সান্নিধ্যে থেকে আল্লাহ তাআলার যিকিরে নিজেকে শামিল করা৷ সাহাবায়ে কেরাম এভাবেই নিজেদের ঈমান মযবুতির লক্ষে একে অপরকে ডেকে দ্বীনি আলোচনা করতেন৷ ঈমান-আমলের আলোচনা করে নিজেদের ঈমান মযবুত করতেন৷ তাঁরা একে অপরকে এভাবে ডাকতেন- اجلس بنا نؤمن ساعة (علقه البخاري) “বসো! একটু সময় ঈমান বৃদ্ধির আলোচনা করি” (বুখারি)

২- গোনাহের কাজ সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা৷ কারণ একেকটি গোনাহ করা মানে অন্তরে একেকটি কালো দাগ পড়া৷ যে দাগগুলো আমাদের ঈমানের উপর আস্তরণ সৃষ্টি করে৷ আর এগুলোর প্রতিবন্ধকতার কারণে আমাদের ঈমানীশক্তি দুর্বল হয়ে আসে৷ তাই ঈমান মযবুত করতে হলে প্রথমেই গোনাহের কাজ ত্যাগ করতে হবে৷ তাছাড়া গোনাহ ত্যাগ করা সর্বোচ্চ ইবাদত৷ হাদিসে এসেছে- ﺍﺗَّﻖِ ﺍﻟْﻤَﺤَﺎﺭِﻡَ ﺗَﻜُﻦْ ﺃَﻋْﺒَﺪَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ তুমি হারাম থেকে বাঁচ, তুমি হবে সবচেয়ে বড় ইবাদতগুজার। -জামে তিরমিযী: ২৩০৫)

৩- বেশি বেশি করে নেক আমল করা৷ কেননা ঈমান তো তিনটা জিনিসের সমষ্টির নাম৷ (এক) অন্তরে আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা (দুই) মুখ দিয়ে স্বীকার করা৷ (তিন) নেক আমল তথা আল্লাহ তাআলার হুকুম-আহকাম (ফরয, নফল) যথাযথভাবে আদায় করা৷ তাই ফরয আদায়ের পাশাপাশি নফল সালাত, নফল সিয়াম, সাদাকা, যিকর-আযকার বেশি বেশি করে আদায় করা৷ এসবগুলো আমল যত বেশি করা যাবে, তত বেশি ঈমান মযবুত হবে৷

৪- আল্লাহ তাআলার মাখলুকাত নিয়ে চিন্তা৷ আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব, মহত্ব, কুদরতের নিদর্শনাবলী, আমাদের উপর তাঁর অপার অনুগ্রহ, জগতের সবকিছুর নেযাম, শৃঙ্খলা এবং চোখধাঁধানো সৃষ্টিশৈলী দেখে নিজের ঈমানকে খাঁটি ও মযবুত করা৷

৫- জান্নাত, জাহান্নাম, কিয়ামতের দিন মহা-পরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলার মুখোমুখি হওয়া, দুনিয়ার জীবনে করা নিজের আমলের হিসাব দেয়া, পুরস্কার কিংবা শাস্তির উপযুক্ত হওয়া সংক্রান্ত বিষয় সংশ্লিষ্ট ওয়াজ ও বয়ান শোনা৷ অভিজ্ঞতা বলে, এসমস্ত বিষয়ের বয়ান শুনলে উদাসীনতার চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমন্ত বিবেক ও দুর্বল ঈমান জাগ্রত হয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যেই৷

৬- দুনিয়াবি ক্ষেত্রে সবসময় নিজের থেকে নিম্নস্তরের মানুষের প্রতি দৃষ্টি ফেলা৷ নিজের থেকে উপরের স্তরের মানুষগুলোর প্রতি ভুলেও ভ্রূক্ষেপ না করা৷ এই পদ্ধতিটি যখন আয়ত্তে আনতে সক্ষম হবেন, দেখবেন দুনিয়ার প্রতি লোভ কমে গেছে৷ নিজের অবস্থার উপর তৃপ্তি এসে গেছে৷

৭- আখেরাত বিষয়ে, নেক আমলের ক্ষেত্রে নিজের থেকে উপরের স্তরের ব্যক্তিদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে খেয়াল করা৷ একথা মনে মনে আফসোস করা যে, “আমার অপর ভাই আমার থেকে কত বেশি আমল করে আমলনামা সওয়াব দিয়ে ভরে নিচ্ছে, পরকালে যখন কোনো কিছুই কাজে আসবে না আমল ছাড়া; তখনকার ভীতিকর সময়ের জন্যে উপযুক্ত পাথেয় সঞ্চয় করে নিচ্ছে, আর আমি কতই না পেছনে পড়ে রয়েছি”৷ ভেতরে এই কথাগুলো জাগ্রত রাখলে ইন-শা আল্লাহ! ঈমানে দুর্বলতা আসবে না, বরং ঈমানিশক্তি বৃদ্ধি পাবে৷ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দরবারে দুআ করি, তিনি যেন আমাদেরকে কঠিন থেকে কঠিনতর প্রতিকূলতার মাঝেও ঈমানকে দৃঢ় রাখার তাওফিক দান করেন এবং দিনদিন ঈমানিশক্তি বৃদ্ধি করে দেন৷ আমীন৷

 

Share.

লেখক পরিচিতি

Leave A Reply

Top