বিজাতীয় উৎসব উপলক্ষে ভাতা-বোনাস -কমিশন এবং আমাদের করণীয়।

0

মুফতি ইমদাদুল হক

পহেলা বৈশাখ/নিউ ইয়ার/বড়দিন/থার্টিফাস্ট নাইট ইত্যাদি দিবসসমূহে চাকুরিজীবিদের জন্য প্রদত্ত ভাতা-বোনাস এবং বিভিন্ন কোম্পানি কর্তৃক ঘোষিত অফারের শরয়ি বিধি-বিধান সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। আসুন এ বিষয়ে কিছুটা চিন্তা করি ও ফুকাহায়ে কেরামগণের সিদ্ধান্ত সমূহকে মনেপ্রাণে মানার মনস্থ করি।
ভাতা, ছাড়, কমিশন, অফার সবকটির মূল অর্থ হল কাউকে ফ্রি-তে কোনো কিছু দেওয়া। যার আরবি প্রতিশব্দ হলো- হাদিয়্যা। সুতরাং প্রচলিত এই শব্দসমূহের শরয়ি ব্যাখ্যা জানতে হলে প্রথমেই আমরা হাদিয়্যা শব্দ ও তার মর্মার্থ এবং প্রক্রিয়াদি সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরামের তাত্ত্বিক আলোচনা জেনে নেই……..
হাদিয়া শব্দের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ সম্পর্কে ‘মাওসুআতুল ফেকহিয়্যাহ’ কিতাবে এভাবে বর্ণিত রয়েছে,
هَدِيَّةٌ
التَّعْرِيفُ:
أ – الْهَدِيَّةُ فِي اللُّغَةِ: هِيَ الْمَال الَّذِي أُتْحِفَ وَأُهْدِيَ لأَِحَدٍ إِكْرَامًا لَهُ، يُقَال: أَهْدَيْتُ لِلرَّجُل كَذَا: بَعَثْتُ بِهِ إِلَيْهِ إِكْرَامًا، فَالْمَال هَدِيَّةٌ (١) .
وَاصْطِلاَحًا عَرَّفَهَا الْحَنَفِيَّةُ بِأَنَّهَا: تَمْلِيكُ عَيْنٍ مَجَّانًا.
হাদিয়া শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো, ঐ মাল যাকে কারো সম্মানার্থে দেয়া হয় বা খরচ করা হয়। যেমন কেউ বলল, আমি অমুককে তা দিয়েছি। আমি তার সম্মানার্থে তার নিকট এই জিনিস প্রেরণ করেছি। যেহেতু মাল দ্বারাই হাদিয়া আদান-প্রদান করা হয়, তাই হাদিয়ার অপর নামই হল মাল/সম্পদ। হানাফি ফুকাহায়ে কেরামদের পরিভাষায় হাদিয়া বলা হয়, ফ্রিতে কাউকে কোনো জিনিসের মালিক বানিয়ে দেয়া। (৪২/২৫২)
কোরআনে কারিমে হাদিয়া শব্দের ব্যবহার রয়েছে। শুনুন- আল্লাহ তা’আলা বলেন,
ﻭَﺇِﻧِّﻲ ﻣُﺮْﺳِﻠَﺔٌ ﺇِﻟَﻴْﻬِﻢ ﺑِﻬَﺪِﻳَّﺔٍ ﻓَﻨَﺎﻇِﺮَﺓٌ ﺑِﻢَ ﻳَﺮْﺟِﻊُ ﺍﻟْﻤُﺮْﺳَﻠُﻮﻥَ০
ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺟَﺎﺀ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﻗَﺎﻝَ ﺃَﺗُﻤِﺪُّﻭﻧَﻦِ ﺑِﻤَﺎﻝٍ ﻓَﻤَﺎ ﺁﺗَﺎﻧِﻲَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺧَﻴْﺮٌ ﻣِّﻤَّﺎ ﺁﺗَﺎﻛُﻢ ﺑَﻞْ ﺃَﻧﺘُﻢ ﺑِﻬَﺪِﻳَّﺘِﻜُﻢْ ﺗَﻔْﺮَﺣُﻮﻥَ
(৩৫)আমি তাঁর কাছে কিছু ‘উপঢৌকন’ পাঠাচ্ছি; দেখি প্রেরিত লোকেরা কি জওয়াব আনে।
(৩৬)তারপর যখন দূত সুলায়মানের কাছে আগমন করল, তখন সুলায়মান বললেন, তোমরা কি ধনসম্পদ দ্বারা আমাকে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদেরকে প্রদত্ত বস্তু থেকে উত্তম। বরং তোমরাই তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে সুখে থাক। সূরা আন্-নামল-৩৫-৩৬
হাদিয়ার ফযিলত সম্পর্কে হযরত আয়েশা রাযি থেকে বর্ণিত রয়েছে
ﻭﻋﻦ ﻋﺎﺋﺸﺔ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﺎ ﻗﺎﻟﺖ : ‏« ﻛﺎﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳَﻘﺒﻞُ ﺍﻟﻬﺪﻳﺔ ﻭﻳُﺜﻴﺐُ ﻋﻠﻴﻬﺎ ‏»
ﺍﻟﻜﺘﺐ ‏» ﺻﺤﻴﺢ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ‏» ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﻬﺒﺔ ﻭﻓﻀﻠﻬﺎ ﻭﺍﻟﺘﺤﺮﻳﺾ ﻋﻠﻴﻬﺎ ‏» ﺑﺎﺏ ﺍﻟﻤﻜﺎﻓﺄﺓ ﻓﻲ ﺍﻟﻬﺒﺔ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং তার বিনিময়/প্রতিদান ও দিতেন। সহীহ বুখারী-২৪৪৫
ﻭﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﻫﺮﻳﺮﺓ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ ﺃﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻗﺎﻝ : ‏« ﻟﻮ ﺃُﻫـﺪﻳـﺖ ﺇﻟـﻲَّ ﺫﺭﺍﻉٌ ﻟﻘﺒـﻠﺖُ، ﻭﻟﻮ ﺩُﻋﻴﺖُ ﺇﻟﻰ ﻛُﺮﺍﻉٍ ﻷَﺟﺒﺖُ ‏»
ﺍﻟﻜﺘﺐ ‏» ﺻﺤﻴﺢ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ‏» ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﻨﻜﺎﺡ ‏» ﺑﺎﺏ ﻣﻦ ﺃﺟﺎﺏ ﺇﻟﻰ ﻛﺮﺍﻉ
হযরত আবু হুরায়রা রাযি থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি কেউ আমার নিকট জন্তুর বাহু হাদিয়া পাঠায়, তাহলে আমি তা কবুল করব। আর যদি কেউ আমাকে পায়ের খুরা রেঁধেও দাওয়াত দেয়, তাহলেও আমি জবাব দিবো। সহীহ বুখারী-৪৮৮৩
ﻭﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﻫﺮﻳﺮﺓ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ ﺃﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻗﺎﻝ : ‏« ﺗﻬﺎﺩﻭﺍ ﺗﺤﺎﺑﻮﺍ ‏»
 ( ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻓﻲ ﺍﻷﺩﺏ ﺍﻟﻤﻔﺮﺩ، ﻭﺍﻟﺒﻴﻬﻘﻲ ﻓﻲ ﺍﻟﺴﻨﻦ، ﻭﻫﻮ ﺣﺪﻳﺚ ﺣﺴﻦ ﻛﻤﺎ ﻗﺎﻝ ﺍﻟﻌﻼﻣﺔ
ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻲ ﻓﻲ ﺇﺭﻭﺍﺀ ﺍﻟﻐﻠﻴﻞ 6/44 ‏)
হযরত আবু হুরায়রা রাযি থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তোমরা পরস্পর হাদিয়া দাও তবে তোমাদের পরস্পর মহব্বত সৃষ্টি হবে। (আল-আদাবুল মুফরাদ) ইরওয়াউল গালিল-৬/৪৪
হাফেয ইবনে আব্দুল বার রাহ বলেন,
[ ﻛﺎﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﻘﺒﻞ ﺍﻟﻬﺪﻳﺔ ﻭﻧﺪﺏ ﺃﻣﺘﻪ ﺇﻟﻴﻬﺎ، ﻭﻓﻴﻪ ﺍﻷﺳﻮﺓ ﺍﻟﺤﺴﻨﺔ ﺑﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ . ﻭﻣﻦ ﻓﻀﻞ ﺍﻟﻬﺪﻳﺔ ﻣﻊ ﺍﺗﺒﺎﻉ ﺍﻟﺴﻨﺔ ﺃﻧﻬﺎ ﺗﻮﺭﺙ ﺍﻟﻤﻮﺩﺓً ﻭﺗُﺬﻫﺐ ﺍﻟﻌﺪﺍﻭﺓ ‏]
ﻓﺘﺢ ﺍﻟﻤﺎﻟﻚ 9/358 .359-
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়া গ্রহণ করতেন, এবং হাদিয়া দিতে উম্মতকে উৎসাহ দিতেন। এতেই নিহিত রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাঃ এর উত্তম আদর্শ ও নমুনা। সুন্নাতের অনুসরণে হাদিয়ার তাৎপর্য হল যে,তা মহব্বত সৃষ্টি করে ও শত্রুতাকে দূর করে। ফতহুল মালিক-৯/৩৫৮-৩৫৯ 
হাদিয়ার বিবিধ বিধি-বিধান বর্ণনা করতে যেয়ে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান শাইবানী রাহ হাদিয়ার বিভিন্ন প্রকার উল্লেখ করে বলেন,
ﺃﻥ ﺍﻟﻬﺪﻳﺔ ﺃﺭﺑﻌﺔ ﺃﻗﺴﺎﻡ ﺑﺎﻋﺘﺒﺎﺭ ﺍﻟﻤُﻬﺪِﻱ ﻭﺍﻟﻤُﻬﺪَﻯ ﺇﻟﻴﻪ ﻭﻫﻲ :
‏( 1 ‏) ﺣﻼﻝٌ ﻣﻦ ﺍﻟﺠﺎﻧﺒﻴﻦ ﻛﺎﻹﻫﺪﺍﺀ ﻟﻠﺘﻮﺩﺩ .
‏( 2 ‏) ﻭﺣﺮﺍﻡٌ ﻣﻨﻬﻤﺎ ﻛﺎﻹﻫﺪﺍﺀ ﻟﻴُﻌﻴﻨﻪ ﻋﻠﻰ ﻇﻠﻢ .
‏( 3 ‏) ﻭﺣﺮﺍﻡٌ ﻋﻠﻰ ﺍﻵﺧﺬ ﻓﻘﻂ، ﻭﻫﻲ ﺃﻥ ﻳﻬﺪﻳﻪ ﻟﻴﻜﻒَّ ﻋﻨﻪ ﺍﻟﻈﻠﻢ .
‏( 4 ‏) ﺃﻥ ﻳﺪﻓﻌﻪ ﻟﺪﻓﻊ ﺍﻟﺨﻮﻑ ﻣﻦ ﺍﻟﻤﻬﺪﻱ ﺇﻟﻴﻪ ﻋﻠﻰ ﻧﻔﺴﻪ ﺃﻭ ﻣﺎﻟﻪ ﺃﻭ ﻋﻴﺎﻟﻪ ﺃﻭ ﻋﺮﺿﻪ، ﻓﻬﺬﻩ ﺣﻼﻝٌ ﻟﻠﺪﺍﻓﻊ ﺣﺮﺍﻡٌ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻤﺪﻓﻮﻉ ﺇﻟﻴﻪ، ﻓﺈﻥ ﺩﻓﻊ ﺍﻟﻀﺮﺭ ﻋﻦ ﺍﻟﻤﺴﻠﻢ ﻭﺍﺟﺐٌ، ﻭﻻ ﻳﺠﻮﺯ ﺃﺧﺬ ﺍﻟﻤﺎﻝ ﻟﻴﻔﻌﻞ ﺍﻟﻮﺍﺟﺐ-
ﺍﻟﻤﻮﺳﻮﻋﺔﺍﻟﻔﻘﻬﻴﺔ ﺍﻟﻜﻮﻳﺘﻴﺔ 42/258
প্রেরক ও প্রাপক হিসেবে হাদিয়া চার প্রকার যথা-
(১) প্রেরক- প্রাপক উভয়ের জন্য হালাল। যেমন- মহব্বত বাড়ানোর উদ্দেশ্যে হাদিয়া যা সাধারণত প্রচলিত।
(২) প্রেরক-প্রাপক উভয়ের জন্য হারাম। যেমন-কারো উপর যুলুম করতে সঙ্গ দানের জন্য কাউকে হাদিয়া প্রদান।
(৩) শুধুমাত্র প্রাপকের জন্য হারাম। যেমন- কারো যুলুম থেকে নিষ্কৃতিলাভ হেতু তাকে হাদিয়া প্রদান।
(৪) নিজ জান-মাল,পরিবারবর্গ ও ইজ্জত-আব্রুকে হেফাজত করার উদ্যেশ্যে হাদিয়া প্রদাণ,প্রেরকের জন্য জায়েয।
লক্ষণীয় যে,প্রেরকের জন্য হালাল হলেও প্রাপকের জন্য তা সম্পূর্ণই হারাম। কারণ একজন মুসলমান থেকে ক্ষতিকে দূর করা অন্য মুসলমানের উপর ওয়াজিব। আর এ ওয়াজিব কাজ সম্পাদন করার জন্য বিনিময় গ্রহণ সর্বাবস্থায় নাজায়েয।
মোটকথাঃ
হাদিয়ার মৌলিকত্বে অপকারজনক কোনো দিক নেই। এবং শরীয়ত ও তাতে বাধা প্রদান করে না। বরং হাদিয়াই সামাজিক বন্ধনকে অটুট রাখে। কিন্তু আনুসঙ্গিক কারণে কখনো কখনো শরীয়ত হাদিয়ার আদান-প্রদানকে নিষেধ করে থাকে। হাদিয়া প্রেরক-প্রাপক ও স্থান কাল পাত্রভেদে হাদিয়ার আদান-প্রদান কখনো জায়েয হয় আবার কখনো নাজায়েয হয়।
পাঠকবর্গ!
হাদিয়া প্রেরকের ধর্ম ও হাদিয়া প্রদানের উপলক্ষ্কে সামনে রেখে, প্রচলিত সরকারি বেসরকারি ভাতা, বিভিন্ন কম্পানির ছাড় বা বোনাসের বিষয়ে চিন্তা গবেষণা করাটাই এখনকার ইলমে ফিকহের দাবী। সুতরাং সে  হিসেবেই আমাদেরকে হাদিয়ার উপর ফেকহী বিধি-বিধান আরোপন করতে হবে।
উপলক্ষ হিসেবে হাদিয়া দু-প্রকার যথা-
(১) সাধারণ হাদিয়া এবং উৎসবমুখি হাদিয়া।
সাধারণ হাদিয়া যা শুধুমাত্র মহব্বতকে সামনে রেখে আদান-প্রদান করা হয়।তা সর্বাবস্থায় সবার জন্য বৈধ।চায় প্রেরক মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক। এবং প্রাপক মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক।
(২) উৎসবমূখী হাদিয়াঃ তা আবার দু-প্রকারের হতে পারে। ইসলামী উৎসব এবং অনৈসলামিক উৎসব।
ইসলামি ঈদ বা উৎসব সমূহে একজন মুসলমান ভিন্ন কোনো মুসলমান বা অমুসলিকে অনায়াসে হাদিয়া প্রদান করতে পারে।
কিন্তু বাধসাধে অমুসলিম বা ইসলাম সমর্থিত নয় এমন কোনো উৎসব বা অনুষ্টানের উপহার-উপটোকন নিয়ে
সেটা জায়েয না নাজায়েয? এ বিষয়টাকে ফুকাহায়ে কিরামগণ আবার দু-ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথা
(১)অনৈসলামিক উৎসবে কোনো অমুসলিম কর্তৃক  মুসলিমকে হাদিয়া প্রদান করা।
(২)মুসলিম কর্তৃক অপর কোনো মুসলিমকে হাদিয়া প্রদাণ করা।
২-বিজাতীয় উৎসব উপলক্ষ্যে ভাতা-বোনাস -কমিশন এবং আমাদের করণীয়।
প্রথম প্রকারঃ বিজাতীয় উৎসবে তাদের কারো কাছ থেকে মুসলমানদের জন্য হাদিয়া গ্রহণ সম্পর্কে ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ বলেন,
ﻭﺃﻣﺎ ﻗﺒﻮﻟﻪ ﺍﻟﻬﺪﻳﺔ ﻣﻨﻬﻢ ﻳﻮﻡ ﻋﻴﺪﻫﻢ، ﻓﻘﺪ ﻗﺪﻣﻨﺎ ﻋﻦ ﻋﻠﻲ ﺑﻦ ﺃﺑﻲ ﻃﺎﻟﺐ – ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ – ﺃﻧﻪ ﺃﺗﻲ ﺑﻬﺪﻳﺔ ” ﻳﻮﻡ ﻧﻴﺮﻭﺯ ” ﻓﻘﺒﻠﻬﺎ .
ﻭﻋﻦ ﻋﺎﺋﺸﺔ – ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﺎ – ﺃﻧﻬﺎ ﻗﺎﻟﺖ : ” ﺃﻣﺎ ﻣﺎ ﺫﺑﺢ ﻟﺬﻟﻚ ﺍﻟﻴﻮﻡ، ﻓﻼ ﺗﺄﻛﻠﻮﺍ، ﻭﻟﻜﻦ ﻛﻠﻮﺍ ﻣﻦ ﺃﺷﺠﺎﺭﻫﻢ .”
ﻭﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﺑﺮﺯﺓ ﺃﻧﻪ ﻛﺎﻥ ﻳﻬﺪﻱ ﺇﻟﻴﻪ ﻣﺠﻮﺱ ﻓﻲ ” ﻧﻴﺮﻭﺯﻫﻢ ” ﻓﻴﻘﻮﻝ ﻷﻫﻠﻪ : ﻣﺎ ﻛﺎﻥ ﻣﻦ ﻓﺎﻛﻬﺔ ﻓﻜﻠﻮﻩ، ﻭﻣﺎ ﻛﺎﻥ ﻣﻦ ﻏﻴﺮ ﺫﻟﻚ ﻓﺮﺩﻭﻩ “
 ﻓﻬﺬﺍ ﻛﻠﻪ ﻳﺪﻝ ﻋﻠﻰ ﺃﻧﻪ ﻻ ﺗﺄﺛﻴﺮ ﻟﻠﻌﻴﺪ ﻓﻲ ﺍﻟﻤﻨﻊ ﻣﻦ ﻗﺒﻮﻝ ﻫﺪﻳﺘﻬﻢ، ﺑﻞ ﺣﻜﻤﻬﺎ ﻓﻲ ﺍﻟﻌﻴﺪ ﻭﻏﻴﺮﻩ ﺳﻮﺍﺀ؛ ﻷﻧﻪ ﻟﻴﺲ ﻓﻲ ﺫﻟﻚ ﺇﻋﺎﻧﺔ ﻋﻠﻰ ﺷﻌﺎﺋﺮ ﻛﻔﺮﻫﻢ،
[ﺍﻟﻤﻨﻬﺞ ﺍﻟﻘﻮﻳﻢ ﻓﻲ ﺍﺧﺘﺼﺎﺭ ﺍﻗﺘﻀﺎﺀ ﺍﻟﺼﺮﺍﻁﺍﻟﻤﺴﺘﻘﻴﻢ-١/١٢٨
ﻓﺼﻞ: ﺣﻜﻢ ﻗﺒﻮﻝ ﺍﻟﻤﺴﻠﻢ ﺍﻟﻬﺪﻳﺔ ﻣﻦ ﺍﻟﻜﻔﺎﺭ ﻳﻮﻡ ﻋﻴﺪﻫﻢ ﻭﺇﻳﺮﺍﺩ ﺍﻟﻨﺼﻮﺹ ﻋﻠﻰ ﺟﻮﺍﺯﻩ]
কাফিরদের কাছ থেকে তাদের উৎসব উপলক্ষ্যে হাদিয়া গ্রহণ সম্পর্কে আমরা ইতিপূর্বে হযরত আলি রাযি.এর হাদিস বর্ণনা করেছি যে, উনার কাছে নাইরুয দিনে হাদিয়া আসলে তিনি তা কবুল করে নেন। এবং হযরত আয়েশা রাযি থেকেও বর্ণিত রয়েছে, তিনি বলেনঃ যে জন্তু সেই উৎসবের নামে যবেহ করা হয়েছে তা তোমরা খেয়ো না।তবে তাদের ফলমূলাদি খেতে পারো।
হযরত আবু বারযাহ রাযি. থেকে বর্ণিত রয়েছে যে,নাইরুয দিনে কোনো এক অগ্নিপূজক তাকে কিছু হাদিয়া দিয়েছিলো, তখন তিনি তার পরিবারবর্গকে বলেছিলেন,হাদিয়া যদি ফলমূলাদি থেকে হয় তাহলে তোমরা খেতে পারো।আর যদি তা অন্যকিছু হয় তাহলে তা তোমরা ফিরিয়ে দাও।
এ সমস্ত রেওয়াত প্রমাণ করে যে,কাফিরদের কাছ থেকে হাদিয়া গ্রহণ তাদের উৎসব সমূহ বাধা প্রদাণ করবে না।বরং যেকোনো সময় তাদের কাছ থেকে হাদিয়া গ্রহণ করা যাবে। কেননা তখন তা কাফিরদের ধর্মীয় কোনো বিষয়ে সাহায্য করা হচ্ছে না।
(আল-মানহাজুল কাওয়ীম ফি ইখতেছারে ইক্বতেযায়িস সিরাতিল মুস্তাক্বিম-১/১২৮)
দ্বিতীয় প্রকার
অমুসলিমদের উৎসবে কোনো মুসলিম কর্তৃক অন্য কোনো মুসলিমকে হাদিয়া দেয়া।যা কখনো জায়েয হবে না।কেননা তখন সেই মনগড়া উৎসব সমূহকে সম্মাণ প্রদর্শন করা হচ্ছে।যা তাদের ধর্মকে সাহায্য করারই নামান্ত।
সুতরাং তা কখনো কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ হতে হবে না।
ইমাম যায়লা’য়ী হানাফি রাহ(মৃত্যু-৭৪৩হি,) বলেন,
قال – رحمه الله – (والإعطاء باسم النيروز والمهرجان لا يجوز) أي الهدايا باسم هذين اليومين حرام بل كفر، وقال أبو حفص الكبير – رحمه الله – لو أن رجلا عبد الله خمسين سنة ثم جاء يوم النيروز، وأهدى لبعض المشركين بيضة يريد به تعظيم ذلك اليوم فقد كفر، وحبط عمله، وقال صاحب الجامع الأصغر إذا أهدى يوم النيروز إلى مسلم آخر، ولم يرد به التعظيم لذلك اليوم، ولكن ما اعتاده بعض الناس لا يكفر، ولكن ينبغي له أن لا يفعل ذلك في ذلك اليوم خاصة، ويفعله قبله أو بعده كي لا يكون تشبها بأولئك القوم، وقد قال رسول الله – صلى الله عليه وسلم – «من تشبه بقوم فهو منهم»، وقال في الجامع الأصغر رجل اشترى يوم النيروز شيئا لم يكن يشتريه قبل ذلك إن أراد به تعظيم ذلك اليوم كما يعظمه المشركون كفر، وإن أراد الأكل والشرب والتنعم لا يكفر.
‘আবুল বারাকাত নাসাফী রাহ, রাহ বলেন, নাইরুয উৎসব এবং মেহেরজান উৎসব এর নামে হাদিয়া দেয়া নাজায়েয।’
অর্থ্যাৎ এই দু’দিনের নামে কোনো কিছু হাদিয়া দেয়া হারাম,এমনকি তা কুফুরী।
আবু-হাফস্ আল-কবীর রাহ. বলেন, যদি কোনো মানুষ পঞ্চাশ বছরেরর অধিক সময় আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করে,অতঃপর নাইরুযের দিনে উক্ত দিনের সম্মানার্থে সে কাউকে একটি ডিমও হাদিয়্যা দেয়, তাহলে যেন সে কুফুরী করল, তার সমস্ত আ’মল বাতিল বলে সাব্যস্ত হবে।
জা’মে আসগরের মুসান্নিফ রাহ লিখেন. যদি নাইরুয দিনে কেউ কাউকে হাদিয়্যা দেয়,এবং সে তা দ্বারা উক্ত দিনের সম্মানকে উদ্দেশ্য না নেয়,বরং সামাজিক প্রচলন হেতু এমনিতেই দেয়,তাহলে সে তখন কাফির হবে না।
তবে তার জন্য উচিৎ হবে, সে যেন এমন কাজ বারবার না করে। কাউকে যদি কিছু দিতেই হয় তবে যেন সে ঐ দিনের পূর্বে বা পরে দিয়ে দেয়।যাতেঐ দিনের সাথে হাদিয়্যার কোনোপ্রকার সম্পর্ক না থাকে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্ক রাখবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। জা’মে আসগর কিতাবে আরোও বর্ণিত রয়েছে, এক ব্যক্তি নাইরুয দিনে কিছু ক্রয় করতে ইচ্ছুক যা সে উক্ত দিনের প্রথমে কখনো ক্রয় করেনি।যদি সে তা দ্বারা উক্ত দিনের সম্মান কে উদ্দেশ্য করে থাকে যেভাবে মুশরিকগণ করে থাকে, তাহলে সে কাফির হবে।আর যদি সে খানাপিনা ইত্যাদির উদ্দেশ্যে ক্রয় করে তাহলে সে তখন কাফির হবে না। তাবয়ীনুল হাক্বাইক্ব-৬/২২৮
ঠিক এভাবে রদ্দুল মুহতার-খুনছা হিজড়া অধ্যায়-বিবিধ মাসাঈল এ বর্ণিত রয়েছে।
ﺍﻟﻜﺘﺐ ‏» ﺭﺩ ﺍﻟﻤﺤﺘﺎﺭ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺪﺭ ﺍﻟﻤﺨﺘﺎﺭ ‏» ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺨﻨﺜﻰ ‏»
ﻣﺴﺎﺋﻞ ﺷﺘﻰ
মাওসুআতুল ফেকহিয়্যাহতুল কোয়েতিয়্যাহ কিতাবে বর্ণিত রয়েছে
ي – الهدية باسم النيروز:
٢٣ – نص الحنفية على أنه لا يجوز الإهداء باسم النيروز كأن يقول عند الإهداء: هذا هدية النيروز والمهرجان، ومثل القول النية، والنيروز أول الربيع والمهرجان أول الخريف، وهما يومان يعظمهما بعض الكفار ويتهادون فيهما.
وإن قصد تعظيمهما كما يعظمهما الكفرة كفر
নাইরুয দিনের নামে হাদিয়্যা-উপটোকন হানাফি মাযহাব মতে নাজায়েয। যেমন- এভাবে কাউকে দান করা যে,এ হল নাইরুয বা মেহেরজান দিবসের উপটোকন। মুখ দিয়ে না বলে নিয়তে থাকলেও সমান হুকুম প্রযোজ্য হবে। নাইরুয হল বসন্তের প্রথম দিবস (পারস্য নববর্ষ)আর মেহেরজান হল শরৎকালের(শারদীয় বর্ষণ)প্রথম দিবস।
এ দু’টি এমন দিবস যাকে কিছুসংখ্যক কাফিররা সম্মান দেয় এবং এ উপলক্ষ্যে একজন অন্যজনকে হাদিয়্যা দেয়। যদি কেউ এই দিবসগুলিকে কাফেরদের মত সম্মান প্রদর্শন করে তাহলে সে কাফির বলে গণ্য হবে। (মাওসুআতুল ফেকহিয়্যাহতুল কোয়েতিয়্যাহ-৪২/২৬১)
সু-প্রিয় পাঠকবর্গ!
  • ফুকাহায়ে কেরাম গণের উপরোক্ত আলোচনার নিমিত্তে আমরা নিম্নবর্ণিত সিদ্ধান্তে উপনীতে হতে সক্ষম হবো যে, (১)
বাংলাদেশ ৯০ ভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ। -যেহেতু অনৈসলামিক উৎসবে মুসলমানদের জন্য পরস্পর হাদিয়া দেওয়া-নেওয়া হারাম, তাই
(ক) এদিনে সরকারী ছুটিসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা প্রদাণ করা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রর জন্য জায়েয হবে না।
(খ) এবং এদিনে কোনো মুসলিম কম্পানি বা অধিকাংশ শেয়ারহোল্ডার মুসলিম -এমন কম্পানি কর্তৃক ছাড় দেওয়া জায়েয হবে না।এবং সেই কমিশনকে গ্রহণ করা জায়েয হবে না।
(গ) এদিনে উৎসবমূখর পরিবেশ সূষ্টি ও তাতে আনন্দ বিনোদন জায়েয হবে না।
(ঘ) যথাসম্ভব সেই আনন্দ স্রোতের উল্টা চলাই তখন ঈমানের দাবী বলে পরিগণিত হবে।
(২)
(ক) অমুসলিম রাষ্ট্রে অবস্থানরত মুসলিম নাগরিকদের জন্য অনৈসলামিক উৎসব উপলক্ষ্যে সেই রাষ্টের ভাতা গ্রহণ করা যদিও জায়েয হবে।তবে গ্রহণ না করাই তাকওয়ার দাবী।
(খ) মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিম কম্পানি কর্তৃক ছাড়/কমিশন গ্রহণ বৈধ।তবে পরিত্যাগই শ্রেয়।
আল্লাহ-ই ভালো জানেন।
লেখকঃ মুফতী ইমদাদুল হক
Share.

লেখক পরিচিতি

Leave A Reply

Top