স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে অতিষ্ঠ স্ত্রী, শ্বশুরকেও বাসায় আসতে বারণ করছে, স্ত্রীর করণীয় কী?

0

প্রশ্ন করেছেন: সুপ্তি শিকদার

স্বামীর সাথে দু মাস হলো ঢাকায় থাকি। এখন আমার বাবা আমাকে দেখতে ঢাকায় আসছেন, কিন্তু আমার স্বামী কিছুতেই তাকে এই বাসায় আসতে দেবেন না। নরম স্বরে অনুরোধ করে কিংবা রাগারাগি করে ও লাভ হয়নি। তার অদ্ভুত যুক্তি হচ্ছে তার পরিবার থেকে তো কেউ আসেনি, আমার বাবা আসবে কেন? আর আমার বাবা এসেছে শুনলে নাকি তার বাবা মা মাইন্ড করবে। কে তাদের জানাবে? এ প্রশ্নের উত্তর পাইনি। যেহেতু সে নিষেধ করেছে, এরপরেও আমার বাবা এ বাসায় এলে সে নাকি আমায় তালাক দেবে।

এদিকে বাবাকে কিভাবে নিষেধ করবো, এ এক অবর্ণনীয় কষ্ট। যদিও আমি শারীরিক এবং মানুষিক ভাবে অনবরত টর্চারের মধ্যে আছি, কিন্তু নিজ পরিবারকে এটা তিলমাত্র বুঝতে দেইনা। সব বাবা মা মেয়ের সুখ চায়, আর আমিও চাই তারা আত্মতৃপ্তিতে থাকুক যে আমি ভালোই আছি। কিন্তু এবার কিভাবে সেই অভিনয় চালিয়ে যাবো? বাবাকে আমার বাসায় আসতে নিষেধ করা মানে সব লুকোচুরি ফাস হয়ে যাওয়া। বাবা ভীষণ কষ্ট পাবে, আর সেই কষ্টটা আমি সইতে পারবো না। আর আমি চাইনা কেউ জানুক যে আমি ভালো নেই।

আমি প্রেগনেন্সির প্রথম স্টেজে আছি। গর্ভবতী জেনেও আমাকে নির্মম ভাবে শারীরিক নির্যাতন করতে তার বাধে না। আমার দোষ গুলো হচ্ছে লবন/ তেল বেশি হওয়া কিংবা ডাল ঘন হওয়া টাইপ।
আমার মা নেই, বয়স্ক বাবা। ভাইয়ের সংসারে থাকে। স্বভাবতই আমি ভাইয়ের সংসারে গিয়ে উঠতে চাই না। আমার স্বামী আমার এই চরম দূর্বলতম স্থানে প্রতিনিয়ত আঘাত করতেই থাকে। প্রায় প্রতিদিনই আমাকে বলে আমি যেন তাকে ছেড়ে দেই, সে অফিস থেকে ফিরে যেন আমাকে না দেখে। এটাও বলে যে নির্লজ্জ বেহায়া, এত মারধর করি তাও রাগ করে একটু সরেও যায় না। আসলে ফকিন্নির যাওয়ার যায়গা নেই, থাকলে তো যাবে।

কথাগুলো আমার হ্রদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। শারীরিক আঘাত হজম করা মানুষিক আঘাতের চেয়ে অনেক সহজ।
তবে ইদানীং আমার মাঝে মাঝে মনে হয় এর কাছ থেকে আমায় পালাতে হবে, না হলে পেটের বাচ্চার ক্ষতি হয়ে যাবে।
আমি মাহরাম, গায়রে মাহরাম মেনে চলি। তবে পর্দাটা আমার নিজেকেই করতে হয়, মানে শশুর বাড়িতে সবসময় বোরখা পড়ে থাকতে হয়। আমি তাকে বলেছিলাম আমাকে প্রপার পর্দার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য, সে অপরাগ।আমাকে এভাবেই পর্দা করতে হবে। সেজন্যই ঢাকা এসেছিলাম। কিন্তু এখানে এসেই এত নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছি। গ্রামে ফিরে যেতে হবে খুব তাড়াতাড়ি ই। এখন কথা হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতি আমি কিভাবে সামলাবো? কিভাবে দুইকূল রক্ষা করবো?

উনি অফিসে থাকেন, বাবা এলে জানতে পারবে না। কিন্তু বাবা তো নিশ্চয়ই ফোন করে তাকে আসার কথা বলবে। বাবাকে কিভাবে বলবো যে তোমার জামাইকে জানিও না? আর স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাবাকে আনা কি ঠিক হবে? যেহেতু সে তালাকের কথা বলে রেখেছে? আমি শুনেছি, গর্ভবতী অবস্থায় তালাক হয় না। এর আগে একদিন রাগে আমি বলেছিলাম যে তালাক দিন। সে দিলাম কিংবা তালাক দিলাম টাইপ কিছু বলেছিলো। যেহেতু আমি গর্ভবতী তাই মাইন্ড করিনি। এ বিষয়ে কি কিছু হবে?

উত্তর প্রদানে: মুফতি জিয়াউর রহমান
ইসলামিক ফিকহ ইনস্টিটিউট, সিলেট

স্ত্রীকে বলা হয় জীবনসঙ্গিনী৷ বাস্তবেও তা-ই৷ মানে স্ত্রী হচ্ছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ৷ একজন স্ত্রী স্বামীর জীবনের সঙ্গে সর্বতোভাবে জড়িয়ে থাকে৷ একজন বিবাহিত পুরুষের জন্যে এই বিষয়টি অস্বীকারের সুযোগ নেই৷ যারাই নিজ জীবনে স্ত্রীর গুরুত্ব অস্বীকার কিংবা অবহেলা করবে, বুঝতে হবে তারা স্ত্রীর হক যথাযথভাবে আদায় করছে না৷

যে মেয়েটি এসে একটি ছেলের অগোছালো জীবনকে গুছিয়ে দিলো৷ যে মেয়েটি এসে একটি ভবঘুরে ছেলের জীবনকে নিয়মের সুতোয় বেধে দিলো৷ যে মেয়েটি এসে একটি অপরিণত ছেলের জীবনকে পরিণত করে দিলো৷ সর্বোপরি যে মেয়েটির অস্তিত্বের সুবাদে একটি অপূর্ণ ঈমানের অধিকারী ছেলের ঈমান পূর্ণতা পেলো- সেই জীবনসঙ্গিনী স্ত্রীর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই৷ বরং এমন একজন স্ত্রীর অস্তিত্ব প্রত্যেক পুরুষের জন্যে অপরিহার্য বটে৷

এখানে স্বামীর উপর স্ত্রীর কয়েকটি হকের কথা উল্লেখ করেই প্রশ্নের মূল সমাধানে চলে যাবো৷

# সামান্য বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সাথে ঝগড়া-বিবাদ না করা। কথায় কথায় ধমক না দেওয়া। রাগ না করা।

# স্ত্রীর আত্মমর্যাদায় আঘাত করে এমন বিষয়ে সংযত থাকা। শুধু শুধু স্ত্রীর প্রতি কুধারণা না করা। স্ত্রীর সম্পর্কে উদাসীন না থাকা।

# সামর্থ্যানুযায়ী স্ত্রীর খোরপোষ দেওয়া। অপচয় না করা।

# একান্ত নিরুপায় না হলে তালাক না দেওয়া এবং প্রয়োজনের ক্ষেত্রে শরীয়ত-গৃহীত পন্থায় তালাক দেওয়া।

# প্রয়োজন মাফিক থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা।

#মাঝে মাঝে স্ত্রীর নিকটাত্মীয়দের সাথে দেখা-সাক্ষাত করার সুযোগ করে দেওয়া।

আবার স্ত্রীর উপরও স্বামীর কিছু হক আছে৷ সেগুলো আর এখানে উল্লেখ করছি না৷ এখন আসি মূল আলোচনায়৷

আসলে বোন, আপনার সার্বিক অবস্থা জেনে খুব কষ্ট হচ্ছে৷ বলতে গেলে নিজের বোন এমন কষ্টে পড়লে যে কষ্টটা পেতাম, সেরকম কষ্টই পাচ্ছি৷ দুআ করি আল্লাহ তাআলা যেন কোনো বোনকেই এমন অবর্ণনীয় ও অমানবিক পরিস্থিতির শিকার না করেন৷ আমীন৷

এক. বিবেক বাধ সাধলেও প্রথমে আপনাকে ধৈর্য ধরার পরামর্শই দিবো৷ অর্থাৎ স্বামী আপনার হকগুলো নষ্ট করে চলেছে ঠিক৷ কিন্তু আপনি চেষ্টা করবেন তার হকগুলো যথাযথভাবে রক্ষা করবার৷ এক্ষেত্রে আপনাকে আরেকটু কৌশলী হয়ে চললে ভালো৷ একটু আদর-যত্ন বাড়িয়ে দিন৷ এবং সুযোগে একথাও বলে দিবেন যে, এই সেবাগুলো করছি এজন্যে যে, ইসলাম আমাকে এর নির্দেশ দিয়েছে, করুণার ভিখারি হয়ে নয়৷ আর দুআ করতে থাকুন সবসময় তার হেদায়াতের জন্যে৷ এত নির্যাতন সত্ত্বেও প্রথমেই আপনাকে ধৈর্য ধরতে এজন্যে বললাম যে, সে কিন্তু আপনার পর্দার সুবিধার জন্যে আপনাকে সাথে করে ঢাকা নিয়ে এসেছে৷ স্বামী হিসেবে এই দায়িত্বটি সে পালন করেছে৷ তাই তার মাঝে পরিবর্তনের আশা করা যায়৷ সবসময় দুআ করতে হবে তার হেদায়াতের জন্যে এবং নিজের কল্যাণের জন্যে৷

দুই. “আপনার বাবা বাসায় এলে সে তালাক দেবে” একথার দ্বারা আপনার বাবা বাসায় এলেও তালাক হবে না৷ কারণ সে “তালাক দেবে” বলেছে৷ মানে ভবিষ্যতে তালাক দেয়ার কথা বলেছে৷ এখন সে যদি নতুন করে তালাক দেয়, তাহলে তালাক হবে৷ নতুবা কেবল ভবিষ্যতের কথার দ্বারা তালাক পতিত হবে না৷ (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৩৮৪, আদ্দুররুল মুখতার: ৩/৩১৯)

তিন. যেহেতু স্বামী আপনার বাবা-মা তার বাসায় আসার ব্যাপারে নিষেধ করেছে৷ এখন যদি আসেন, তাহলে দুর্ব্যবহারও করতে পারে, তাই পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত না আসারই পরামর্শ দেবো৷ তবে মেয়ের বাসায় বাবা-মা আসতে শরীয়তে বিধিনিষেধ নেই৷ তবে যে হাদিসে এসেছে-
ﻭَﻟَﺎْ ﺗَﺄْﺫَﻥ ﻓِﻲ ﺑَﻴﺘِﻪِ ﺇِﻻّ ﺑِﺈِﺫﻧِﻪِ.
এবং স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘরে কাউকে থাকতে দেওয়াও বৈধ নয়। (সহীহ বুখারী: ১৫৯৫, মুসলিম: ১০২৬)

এই হুকুম বাবা-মার বেলায় প্রযোজ্য নয়৷ কেননা স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর বাবা-মাকে বাসায় আসতে বারণ করার দ্বারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হয় আর শরীয়তে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম৷

হানাফি এবং মালেকি মাযহাব মতে সপ্তাহে একদিন বাবা-মা মেয়ের বাড়িতে এলে স্বামী নিষেধ করতে পারে না৷ অন্য মাহরাম আত্মীয়স্বজন বছরে একবার এলে নিষেধ করতে পারেন না৷ আর হাম্বলি মাযহাব মতে তো বিনা কারণে স্ত্রীর বাবা-মাকে স্বামী আসতে কখনোই বারণ করতে পারবে না৷ (আল-মাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ: ২৪/৮২)

চার. গর্ভাবস্থায় তালাক পতিত হয়৷ তবে তালাকের ইদ্দত পালন করতে হয় সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত৷ কুরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
ﻭَﺃُﻭْﻻﺕُ ﺍﻷَﺣْﻤَﺎﻝِ ﺃَﺟَﻠُﻬُﻦَّ ﺃَﻥْ ﻳَﻀَﻌْﻦَ ﺣَﻤْﻠَﻬُﻦَّ.
গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তানপ্রসব পর্যন্ত৷ (সুরা তালাক, আয়াত: ৪)

আপনার তালাক চাওয়ার পর সে যেহেতু বলেছে “দিলাম” তাই একবার বলার দ্বারা এক তালাকে রাজয়ি পতিত হয়ে গেছে৷ এরপর সে যদি আপনাকে ফিরিয়ে নেয়, তাহলে তো আপনাদের বিবাহ বহাল রয়েছে৷ অর্থাৎ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে আগে স্ত্রীসূলভ আচরণ করে নিলে বিবাহ বহাল থাকবে৷ তালাকের পর স্ত্রীসূলভ কোনো ব্যবহার না করলে এবং ইদ্দতের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যাবে৷

পাঁচ. সর্বশেষ আপনার পক্ষে যদি এই স্বামীর সংসার করতে আর সম্ভব না হয়৷ নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে আপনার এবং গর্ভের সন্তানের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়, তাহলে আপনি তার কাছ থেকে ফাইনালি তালাক চেয়ে নিতে পারেন৷ এ ক্ষেত্রে আপনি অক্ষম৷ বিবাহবিচ্ছেদই সর্বশেষ সমাধান৷

হাদীসে এসেছে-
ﺃَﻳُّﻤَﺎ ﺍﻣْﺮَﺃَﺓٍ ﺳَﺄَﻟَﺖْ ﺯَﻭْﺟَﻬَﺎ ﻃَﻠَﺎﻗًﺎ ﻣِﻦْ ﻏَﻴْﺮِ ﺑَﺄْﺱٍ ﻓَﺤَﺮَﺍﻡٌ ﻋَﻠَﻴْﻬَﺎ ﺭَﺍﺋِﺤَﺔُ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔِ.
যে নারী কোনো সমস্যা ছাড়াই তার স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের ঘ্রাণ পর্যন্ত হারাম৷ (তিরমিযী: ১১৮৭, আবু দাউদ: ২২২৬, ইবনে মাজাহ: ২০৫৫)

হাদিসের এই অংশ “কোনো সমস্যা ছাড়া” থেকে বোঝা গেলো, শরয়ী সমস্যা যেমন, জুলুম, নির্যাতন ও জ্বালাতনের কারণে তালাক চাওয়ার সুযোগ রয়েছে৷ বরং ক্ষেত্রবিশেষে কিছু স্বামীর অধিন থেকে মুক্ত হওয়া জরুরিও বটে৷

তবে সিদ্ধান্তে যাওয়ার পূর্বে অবশ্যই বাবা এবং ভাইদেরকে বিস্তারিত বিষয়টি অবগত করে তাদের পরামর্শ এবং সহযোগিতা নেওয়া প্রয়োজন৷ যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে, মোহরানা দেওয়া থেকে বাঁচার জন্যে সে তালাক দিচ্ছে না, নতুবা তালাক দিয়ে দিতো৷ এবং আপনাকে জ্বালাতন করছে যাতে নিজ থেকে আপনি চলে যান, তাহলে তো আইনের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন৷ আল্লাহ তাআলাই আপনার সহায় এবং আশ্রয়দাতা হবেন ইন-শা আল্লাহ!
والله تعالى أعلم.

 

Share.

লেখক পরিচিতি

Leave A Reply

Top