অবহেলিত দুটি সুন্নাত ও বিজ্ঞানিদের গবেষণা

0

আব্দুল হামিদ সাকিব 

রাসুলের প্রত্যেকটি সুন্নতই মানবজীবনের জন্য কল্যাণকর। এমন একটি সুন্নাত ও পাওয়া যাবেনা যাতে কোন অকল্যাণ আছে। অলসতা, অমনোযোগিতা, জ্ঞানসল্পতার দরুন আমরা তার সুন্নতের পাবন্দি করছিনা। কিন্তু হাজার বছর গবেষনার পর অমুসলিম বিজ্ঞানিরা পর্যন্ত সুন্নতের গুরুত্ব স্বীকার করতেছে। মানুষকে এই সুন্নতের দিকেই আহবান করছে তাদের নিজস্ব পরিভাষায়। আর লোকেরা ভাবছে এগুলো বুঝি বিজ্ঞানীদের থিওরি।

এ রকম একটি সুন্নত হল ” রাত্রে তাড়াতাড়ি ঘুমানো, এবং খুব ভোরে জাগ্রত হওয়া “।

মানবতার সম্রাট বিশ্বনবি স, ১৪০০ বছর পূর্বে এর প্রতি গুরুত্বারোপ করে গেছেন। নিজেও আমৃত্যু তার উপর আমল চালিয়ে গেছেন।

হাজার বছর পরে এখন বিজ্ঞানী,ও দক্ষ চিকিৎসকরা এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, এই সুন্নতের খেলাফ করলে নানাবিধ রোগ দেখা দিবে। মানুষের মেধা ও মননে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। জীবন চলার স্বাভাবিকতা ও ভারসাম্যতা হারিয়ে যাবে।

রাসুলের হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি…..

عَنْ صَخْرٍ الغَامِدِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا»، قَالَ: وَكَانَ إِذَا بَعَثَ سَرِيَّةً، أَوْ جَيْشًا، بَعَثَهُمْ أَوَّلَ النَّهَارِ،

( তিরমিযি ১২১২.আবু দাউদ ২৬০৬)

রাসুলুল্লাহ স, দোয়া করলেন : হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য ভোরবেলাকে বরকতময় করে দিন । আর তিনি স, সকল প্রকার বাহিনী ভোরবেলায়ই প্রেরণ করতেন।

আমেরিকা,কানাডা ও জার্মানির চিকিৎসকরা এক পরিমাণ লোকের উপর গবেষনা চালিয়ে দেখেছেন : যে লোক গুলো ঘুম থেকে দেরি করে জাগ্রত হচ্ছে তারা সারাদিন মানসিক ভোগান্তির মধ্যে কাটিয়েছ। এমনকি কমন বিষয়গুলো তাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে।

বিজ্ঞানি ” ডিন সোফ্ট ” বলেন :

“আমি পৃথিবীতে এমন কোন লোককে বড় হতে দেখিনি যে দেরিতে ঘুম থেকে জাগ্রত হইত “।

Sir Gerald du Maurier বলেন :

আজ আমি একশ বছর বয়সে ও সব কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে করতে পারছি। এর মুল রহস্য হল –

” আমি আজীবন রাত্রে তাড়াতাড়ি ঘুমাই এবং খুব ভোরে জাগ্রত হই “।

Charles Luckman বলেন :

” আমি বছরে এক লাখ ডলার বেতন পাই। কিন্তু অল্প পরিশ্রমেই আরো একলাখ ডলার অতিরিক্ত ইনকাম করতে পারি। কারন আমি সারাজীবন ধরে ভোর ৫ টায় জাগ্রত হই। আর তখনই আমার সারাদিনের পরিকল্পনাগুলো ঠিক করে নেই “।

* এ রকম আরেকটি সুন্নাত হল –

” মাটিতে বসে খানা খাওয়া “।

আমরা মাটিতে বসে খানা খাওয়াকে লজ্জাজনক মনে করছি। ভদ্রতার দোহাই দিয়ে এই সুন্নাত থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছি। চেয়ার টেবিলে বসে খাওয়ার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিজেদের অজান্তে কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি? কত উপকারিতা থেকে মাহরুম হচ্ছি তা একবারও ভাবছিনা।

কিন্তু আজকাল চিকিৎসা বিজ্ঞানিরা গবেষনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছেন যে, “মাটিতে বসে খাওয়া ” নিঃসন্দেহে মানুষের জন্য উপকারি। অনেক কঠিন রোগ থেকে মানুষকে পরিত্রান দিতে পারে। যা চেয়ার টেবিলে বসে খাওয়ার বেলায় পাওয়া যায়না।
অথচ ১৪০০ বছর পূর্বে “নবীয়ে রহমত স, এই সুন্নতের প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। নিজের সাহাবিগনকে নিয়ে এই সুন্নতের উপর জীবন কাটিয়েছেন। চেয়ার টেবিলে বসে খেয়েছেন এর কোন প্রমাণই পাওয়া যায়না।

রাসুলের হাদিস থেকে আমরা জানতে পাই –

عن أنس بن مالك قال : ” ما أكل النبي صلى الله عليه وسلم على خوان ولا في سكرّجة ولا خبز له مرقّق ، قلت لقتادة : على ما يأكلون قال على السفر “. رواه البخاري ( 5099 )

রাসুলুল্লাহ স, কখনো টেবিলের উপর রেখে খানা খেতেন না। এবং বিলাসিতা বসত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাত্রে খানা খেতেন না। তার জন্য পাতলা রুটিও পাকানো হতোনা। কাতাদাকে জিজ্ঞাসা করা হলো সাহাবিরা কিসের উপর রেখে খানা খাইতেন? তিনি বললেন : দস্তরখানার উপর।
(সাহিহ বুখারী : ৫০৯৯)

এদিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানিরা ” মাটিতে বসে খাওয়ার “অনোক গুলো বিস্ময়কর স্বাস্থ্য উপকারিতা নির্ণয় করেছেন।

মাটিতে বসে খাওয়ার বিস্ময়কর স্বাস্থ্য- গবেষণায় দেখা গেছে-

টেবিল-চেয়ারে বসে খাবার খেলে পেট ভরে ঠিকই, কিন্তু শরীরের কোনও মঙ্গল হয় না। বরং নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা যায় বেড়ে।

অন্যদিকে মাটিতে বাবু হয়ে বসে খেলে একাধিক উপকার পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে শরীরও রোগ মুক্ত হয়।

* বোল্ডস্কাই এর প্রতিবেদন অনুযায়ী নিচে মাটি বসে খাওয়ার উপকারিতা তুলে ধরা হলো।

১, মাটিতে বসে খেলে একাধিক আসন করা হয়:- মাটিতে বসে খাওয়ার সময় আমরা নিজেদের অজান্তেই একাধিক আসন, যেমন- সুখাসন, সোয়াস্তিকাসন অথবা সিদ্ধাসন করে ফেলি। ফলে মাটিতে বসে খাওয়ার সময় পেট তো ভরেই সেই সঙ্গে শরীর ও মস্তিষ্ক, উভয়ই ভিতর থেকে চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

২ , শরীর শক্তপোক্ত হয়:- মাটিতে বসে খাওয়ার অভ্যাস করলে থাই, গোড়ালি এবং হাঁটুর কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে শিরদাঁড়া, পেশি, কাঁধ এবং বুকের ফ্লেক্সিবিলিটিও বাড়ে। ফলে সার্বিকভাবে শরীরে সচলতা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি নানাবিধ রোগও দূরে থাকে।

৩, হজম ক্ষমতার উন্নতি হয়:- বাবু হয়ে বসে খেলে হজম ক্ষমতার উন্নতি হয়। তাই যাদের বদ হজমের সমস্যা রয়েছে বা যারা প্রায়শই গ্যাসের সমস্যায় ভোগেন তাদের ভুলেও টেবিল চেয়ারে বসে খাওয়া উচিত নয়। পরিবর্তে মাটিতে বসে পাত পেরে খাওয়া উচিত। আসলে বাবু হয়ে বসে খাওয়ার সময় আমরা কখনও আগে ঝুঁকে পরি, তো কখনও সোজা হয়ে বসি।

৪, এমনটা বারে বারে করাতে হজম সহায়ক ডায়জেস্টিভ জুস’র ক্ষরণ বেড়ে যায়। ফলে হজম প্রক্রিয়া খুব সুন্দরভাবে হতে থাকে।

৫, মাটিতে বসে থাকার সময় আমাদের শিরদাঁড়ার নিচের অংশে চাপ পরে ফলে স্ট্রেস লেভেল কমে গিয়ে সারা শরীর চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

৬, আয়ু বৃদ্ধি পায়:- মাটিতে বসে খেলে শরীরের সচলতা বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে শরীরের অন্দরে কোনও ধরনের ক্ষয়-ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও হ্রাস পায়। প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে ইউরোপিয়ান জার্নাল অব প্রিভেন্টিভ কার্ডিওলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে বলা হয়েছিল যারা কোনও সাপোর্ট ছাড়া মাটিতে বসে থাকতে থাকতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পরতে পারেন,

তাদের শরীরে ফ্লেক্সিবিলিটি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি একাধিক অঙ্গের কর্মক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটে, ফলে স্বাভাবিক ভাবেই আয়ু বৃদ্ধি পায়। আর যারা এমনটা করতে পারেন না, তাদের আয়ু অনেকাংশেই হ্রাস পায়। প্রসঙ্গত, এই গবেষণাটি ৫১-৮০ বছর বয়সীদের মধ্যে করা হয়েছিল।

৭, ব্যথা কমে:- বেশ কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে মাটিতে বসে খাওয়ার সময় আমরা মূলত পদ্মাসনে বসে থাকি। এইভাবে বসার কারণে পিঠের, পেলভিসের এবং তল পেটের পেশীর কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে সারা শরীরের কর্মক্ষমতা এত মাত্রায় বৃদ্ধি পায় যে সব ধরনের যন্ত্রণা কমে যেতে সময় লাগে না।

৮, ওজন কমে:- মাটিতে বসে খাওয়ার সময় আমাদের ভেগাস নার্ভের কর্মক্ষমতা বেড়ে যায়। ফলে পেট ভরে গেলে খুব সহজেই ব্রেনের কাছে সে খবর পৌছে যায়। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার ইচ্ছা চলে যায়। এমনটা যত হতে থাকে তত ওজন বৃদ্ধির আশঙ্কাও কমে।

প্রসঙ্গত, আমাদের পেট ভরেছে কিনা সেই খবর ব্রেনের কাছে পৌঁছালেই আমাদের খাওয়ার ইচ্ছা চলে যায়। আর এই খবর মস্তিষ্ককে পাঠায় ভেগাস নার্ভ।

৯, হার্টে কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়:- হাঁটু মুড়ে বসে থাকাকালীন শরীরের উপরের অংশে রক্তের প্রবাহ বেড়ে যায়। ফলে হার্টে কর্মক্ষমতা বাড়তে শুরু করে। সেই সঙ্গে হ্রাস পায় কোনও ধরনের হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও।

১০, সারা শরীরে রক্ত চলাচলের উন্নতি ঘটে:- আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে প্রতিটি অঙ্গে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত পৌঁছে যাওয়াটা জরুরি। যত এমনটা হবে, তত রোগের প্রকোপ কমবে। সেই সঙ্গে সার্বিকভাবে শরীরও চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

আর যেমনটা আগেও আলোচনা করা হয়েছে যে বাবু হয়ে বসে থাকাকালীন সারা শরীরে বিশুদ্ধ অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্তের চলাচল বেড়ে যায়।

১১, স্ট্রেসের মাত্রা কমে:- শুনতে আজব লাগলেও একাধিক স্টাডিতে দেখা গেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাটিতে বসে থাকলে শরীর এবং মস্তিষ্কের অন্দরে বেশ কিছু পরিবর্তন হতে শুরু করে, যার প্রভাবে স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ কমে যায়।

ফলে মানসিক অবসাদ তো কমেই, সেই সঙ্গে স্ট্রেসর মাত্রাও কমতে শুরু করে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে গুরুত্বের সাথে সুন্নতের উপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন

লেখকঃ মাওলানা আব্দুল হামিদ সাকিব।

মুহাদ্দিস : জামেয়া ইসলামিয়া আব্বাসিয়া কৌড়িয়া ইসলামাবাদ।

Share.

লেখক পরিচিতি

Leave A Reply

Top