পর্দার অনুশীল: গুরুত্বের প্রধান ক্ষেত্র যেখানে আপন ঘর

0

পর্দার অনুশীল: গুরুত্বের প্রধান ক্ষেত্র যেখানে আপন ঘর

লিখেছেন- মুফতি জিয়াউর রহমান

আল্লাহ তাআলা পুরুষ ও নারি জাতিকে ভিন্ন কাঠামো ও আদলে সৃষ্টি করেছেন৷ উভয়ের কর্মক্ষেত্রও ঠিক করে দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন স্থানে৷ পুরুষদের কর্মক্ষেত্র হচ্ছে, ঘরের বাইরে এবং নারীদের কর্মক্ষেত্র হচ্ছে, ঘরের অভ্যন্তরে৷ আল্লাহ তাআলা পুরুষের দৈহিক সক্ষমতা তাদেরকে ঘরের বাইরে কাজ করার অনুকূল বানিয়ে দিয়েছেন৷ আর নারিদের দৈহিক সক্ষমতা ঘরের অভ্যন্তরে কাজ করার অনুকূল বানিয়ে দিয়েছেন৷ যদি কোনো প্রয়োজনে নারিদের ঘর থেকে বের হতেই হয়, এমনভাবে বড় চাদর কিংবা বোরকা পরে বের হতে হবে, যেন কোনোভাবেই শারীরীক অবয়ব পরপুরুষের সামনে ভেসে না ওঠে৷ এতেই তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে৷ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

“হে নবি! আপনি আপনার পত্নিগণকে ও কন্যাগণকে এবং মু’মিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের বড় চাদরের বিশেষ অংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে (আযাদ মহিলা হিসাবে) চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে কেউ কষ্ট দিবে না।” (সূরা আহযাব-৫৯)

এখন আসা যাক মূল আলোচনায়৷ যেহেতু আমরা সকলেই একথা জানি এবং মানি যে, শরিয়তের হুকুম হচ্ছে, নারিদের মূল অবস্থানস্থল হবে ঘরের অভ্যন্তর৷ প্রয়োজনে বাইরে বের হলে বোরকা কিংবা চাদরমুড়ি দিয়ে তারা বের হবে৷ তাহলে কী একথা প্রমাণিত হয় যে, নারীদের জন্যে ঘরের অভ্যন্তরে পর্দা করতে হবে না? বা ঘরের ভেতরে তাদের পর্দা রক্ষা করে চলার হুকুম নেই? এরকম একটি ক্ষীণ বিশ্বাসগত মারাত্মক ভুল প্রবণতা আমাদের মাঝে দিনদিন প্রকট আকার ধারণ করছে বলেই এ বিষয়ে আলোকপাতের জন্যে ছোট্ট পরিসরে এই ক্ষুদ্র প্রয়াস৷

জানাশোনা নেই এমন মানুষ ছাড়াও জানাশোনা আছে এমন ব্যক্তিরাও আজ এই ভয়াবহ মারাত্মক ভ্রান্তিতে পড়ে রয়েছেন যে, নারিদের জন্যে মনে হয় ঘরে অবস্থানকালীন সময়ে পর্দা রক্ষা করে চলতে হয় না (নাউযুবিল্লাহ)৷ অথচ নারিদের পর্দা করে চলার সূচনাই হবে আপন ঘর হতে৷ গুরুত্বহীনতার কারণে গায়রে মাহরাম পুরুষের আনাগোনার সুযোগে ক্ষেত্রবিশেষে বাইর থেকে ঘরেই ফিতনা সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায় বেশি৷ তাই বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই মেয়েরা ঘরের ভেতরে পর্দা করে চলাফেরা শুরু করে দেবে, এটাই তাদের জন্যে পর্দার প্রাথমিক সবক৷ বাবা, ভাই, চাচাসহ মাহরাম পুরুষের সামনে নিজেকে গুটিয়ে শালীনভাবে বের হবে৷ মাহরাম বলে তাদের সামনে অশালীনভাবে বের হওয়া শরীয়ত কখনোই সমর্থন করে না৷

গায়রে মাহরাম হলে তো বয়ঃসন্ধির আগ থেকেই পর্দা করে চলা শুরু করে দেয়া উচিত৷ হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রাহ.) বলেন, গায়রে মাহরাম অনাত্মীয় হলে তাদের থেকে সাত বছর পূর্ব হতেই পর্দা করা উচিত এবং গায়রে মাহরাম আত্মীয় হলে সাত বছর থেকেই পর্দা করা উচিত। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে সাবালিকা মহিলা সামনে আসা-যাওয়া করাতে এ পরিমাণ ফিতনার আশংকা থাকে না, যে পরিমাণ আশংকা থাকে কারীবুল বুলুগ তথা বয়ঃসন্ধির কাছাকাছি সময়ের মেয়েদের সামনে আসা-যাওয়া করাতে। (ইসলাহে খাওয়াতীন-৩৭২)

আপন গৃহেও নারির পর্দায় থাকা আবশ্যক। নারি তার গৃহে কাপড় পাল্টাতে পারে, বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে পারে, কিংবা গরম হতে রক্ষা পেতে, হয়তো একটু গায়ের কাপড় হাল্কা করে বিশ্রাম নিতে পারে। তাই অন্যের ঘরে ঢোকার সময় অনুমতি নেয়া প্রয়োজন। তা না হলে বেপর্দায় নারি অবাঞ্ছিত অবস্থায় পড়তে হতে পারে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার ঘোষণা-
“হে ঈমানদারগণ! নিজেদের গৃহ ব্যতিত অনুমতি ছাড়া কারো ঘরে প্রবেশ করো না। যতক্ষণ পর্যন্ত ঘরের লোকদের নিকট থেকে অনুমতি না পাবে এবং যখন ঢুকবে তখন ঘরের অধিবাসিদের সালাম বলবে।এই নিয়ম তোমাদের জন্য কল্যাণকর।আশা করা যায় তোমরা এর প্রতি অবশ্যই খেয়াল রাখবে।”(আন নূর, আয়াত নং-২৭)

“তোমাদের ছেলেরা যখন বুদ্ধির পরিপক্কতা পর্যন্ত পৌঁছাবে, তখন তারা যেন অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। যেমন তাদের বড়রা অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢোকে। এভাবেই আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ তোমাদের সামনে উন্মুক্ত করে দেন। তিনি সর্বজ্ঞাত ও প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আন-নূর: আয়াত নং-৫৯)
গায়রে মাহরাম আত্মীয়দের সঙ্গে পর্দার বিধান পালনে আমাদের সমাজে সবচে বেশি উদাসীনতা ও শিথিলতা লক্ষ্য করা যায়৷ বিশেষত চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই, ফুফাতো ভাই, বিয়ের পর দেবর, ভাসুর প্রমুখ আত্মীয়ের সঙ্গে পর্দা রক্ষা করে চলার কোনো গুরুত্বই আমরা অনুধাবন করি না৷ অথচ আত্মীয়তার সুবাদে বেশি আনাগোনার কারণে পর্দার লংঘন এদের সঙ্গেই বেশি হয়৷ ফিতনায় নিপতিত হওয়ার আশঙ্কা এদের থেকেই বেশি থাকে৷ এজন্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে এ বিষয়টির আলোকপাত করে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন৷

হযরত উকবা ইবনে আমির রা, থেকে বর্ণিত।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: তোমরা মহিলাদের নিকট (একাকি) প্রবেশ করা থেকে বিরত থাক। আনসারদের মধ্যে এক সাহাবি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! দেবরের ব্যাপারে কি নির্দেশ? তিনি বললেন: দেবর তো মৃত্যুতুল্য। (সহীহ বুখারি: ৪৯৩৪, সহীহ মুসলিম: ৫৮০৩)

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলি আল-ক্বারি রাহ, বলেন, একাএকি এবং খোলামেলাভাবে না-মাহরামদের সঙ্গে মিলিত না হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এই হাদিসে৷ (মিরকাত: ৩/৪১০)

পরপুরুষের প্রতি নারিদের দৃষ্টিপাত:

পরপুরুষের জন্যে নারিদের প্রতি তাকানো যেমন হারাম, প্রয়োজন ছাড়া নারিদের জন্যেও পর-পুরুষের দিকে তাকানো হারাম৷ অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এই মতামত ব্যক্ত করেছেন৷ সরাসরি দেখা আর টিভির পর্দায় দেখার একই হুকুম৷
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

“ঈমানদার নারিদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে৷” (সূরা আন-নূর: ৩১)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে মা’আরেফুল কুরআনে বলা হয়েছে: “এ থেকে জানা গেল যে, মাহরাম ব্যতীত কোন পুরুষের প্রতি দৃষ্টিপাত করা নারীদের জন্যে হারাম৷ অনেক আলেমের মতে নারীদের জন্যে মাহরাম নয়, এমন পুরুষের প্রতি দেখা সর্বাবস্থায় হারাম৷ কামভাব সহকারে বদ-নিয়তে দেখুক অথবা এ ছাড়াই দেখুক৷ তার প্রমাণ হযরত উম্মে-সালামা বর্ণিত হাদীস যাতে বলা হয়েছে: একদিন হযরত উম্মে-সালামা ও মায়মূনা রা, উভয়েই রাসূলুল্লাহ সা, এর সাথে ছিলেন৷ হঠাৎ অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে-মাকতূম রা, সেখানে আগমন করলেন৷ এই ঘটনার সময়কাল ছিল পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর৷ রাসূল সা, তাঁদের উভয়কে পর্দা করতে আদেশ করলেন৷ উম্মে-সালামা আরয করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে তো অন্ধ, সে আমাদেরকে দেখতে পাবে না এবং আমাদেরকে চেনেও না৷ রাসূলুল্লাহ সা, বললেন: তোমরা তো অন্ধ নও, তোমরা তাকে দেখছ৷ (আবু দাউদ, তিরমিযী)

অপর কয়েকজন ফেকাহবিদ বলেন: কামভাব ব্যতিত বেগানা পুরুষকে দেখা নারীর জন্যে দোষণীয় নয়৷ তাদের প্রমাণ হযরত আয়েশার রা, হাদীস, যাতে বলা হয়েছে:

“আয়েশা রা, বলেন: আমি দেখলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আড়াল করছেন আর (আড়ালে দাঁড়িয়ে) আমি দেখতে থাকলাম যে, মসজিদে হাবশীরা কুচকাওয়াজ করছে৷” (বুখারী: ৯৮৮, মুসলিম: ৮৯২)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশাকে নিষেধ করেন নি৷ তবে এব্যাপরে সবাই একমত যে কামভাব সহকারে দেখা হারাম এবং কামভাব ব্যতিত দেখাও অনুত্তম৷” (মা’আরেফুল কুরআন)
এই আয়াতের তাফসীরে আল্লামা ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসীর রাহ, বলেন:

“এজন্যে অনেক উলামায়ে কেরামের মতামত হচ্ছে, নারীদের জন্যে মাহরাম নন, এমন পুরুষের প্রতি তাকানো জায়েয নয়, চাহে কামভাব সহকারেই হোক কিংবা কামভাব ছাড়াই হোক৷” (ইবনে কাসীর, সূরা আন-নূর: ৩১)

পরিশিষ্ট: পর্দা নারিদের জন্যে বন্দিদশা নয়; পর্দা নারিদের সার্বিক নিরাপত্তার রক্ষাকবচ৷ পর্দা সাধারণের চোখে নারিদের সমীহের আসনে বসানোর একমাত্র ব্যবস্থা৷ পর্দার বিধানকে কিছু জ্ঞানপাপী ‘পর্দাপ্রথা’ আখ্যায়িত করে পর্দার মতো গুরুত্বপূর্ণ ফরয বিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়৷ অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, পর্দা কোনো ‘প্রথা’ নয়৷ পর্দা এমন একটি ঐশী বিধান, যার অস্বীকারকারীর ঈমান থাকবে না৷ পর্দা এমন একটি কুরআনি বিধান, যা পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার অন্যতম চাবিকাঠি৷

পর্দার বিধানকে যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পুরুষের চোখের হেফাজতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে৷ নারিদের জন্যে পর্দা পালন যেমন ফরয, পুরুষের জন্যে পরনারি থেকে চোখের হেফাজত করে চলাও ফরয৷ গোনাহের সূত্রপাত হয় চোখ থেকে৷ এজন্যে পরনারির প্রতি তাকানোকে হাদিসে চোখের যিনা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে৷ তাহলে বুঝা গেলো, নারিদের জন্যে পর্দা করে চলা যেমন ফরয, পুরুষের জন্যে চোখ হেফাজত করে চলাও ফরয৷ তাই আসুন, নারি ও পুরুষ জাতি উভয়ে নিজ নিজ ফরয পালনের প্রতি যত্নবন হই; সমাজ বদলে যাবে৷ অশান্ত সমাজে শান্তি ফিরে আসবে৷

লেখক: নির্বাহি পরিচালক ও আমীনুত তা’লীম ইসলামিক ফিকহ ইনস্টিটিউট, সিলেট৷

Share.

লেখক পরিচিতি

mm

Leave A Reply

Top