মিল্লাতের অতন্দ্র প্রহরী আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী রহঃ

0

আকাবীরদের জীবনী। (পর্বঃ দুই)

আল্লামা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী ছিলেন (১৯২৮-২০০৪) বিংশ শতকের ভঙ্গুর অবক্ষয়গ্রস্থ সমাজে এক আলোকিত মনীষি। নেতৃত্বহীন জাতি গোষ্ঠির অবিস্মরণীয় নেতা, ইলমুল ওয়াহীর সুগভীর সমঝদার, জ্ঞানহীন মানুষের আলোর হাতিয়ার, মানুষ গড়ার সুনিপুন কারিগর, অসহায় জনের দরদী অভিভাবক, রাজধানীর বুকে মফস্বলি প্রভাবকে বহুমুখী চিন্তার প্রশস্ত সারোবর, মানবিক চেতনার বাস্তব চিত্রকর, ইসলামী আন্দোলনের আপোষহীন সিপাহসালার উলামায়ে কেরামের ঐক্যের চিন্তক, সুষ্ঠু চিন্তাধারার রাজনৈতিক প্রবর্তক, তরুণ ইসলামী চিন্তাবিদদের নীতি নির্ধারক, বাবায়ে জমিয়ত, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া বিশ্বনাথের মতো মানুষ গড়ার কারখানার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম বিশিষ্ট দানবীর ও সমাজ সংস্কারক।

১৯২৮ মানে বিশ শতকের প্রথমার্ধ। ভারত উপমহাদেশের দুর্যোগকাল অতিবাহনের সংবাদ প্রসিদ্ধির কাল। সাথে সাথে বীর ভারতের মনোবল প্রদর্শনের সংশ্লিষ্ট সময়। বিপ্লবের পদচিহ্নিত যামানা। শৃঙ্খল ছেড়ার শক্ত প্রয়াসের কিংবদন্তিকাল। ভারতের মানুষ ফিরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতিপর্ব অতিক্রম করছিলো। হারানো স্বকীয়তাকে ফিরে পাবার তাড়নায় উপমহাদেশের আকাশে এক ঝাঁক আবাবিলের ডানার শব্দ শুনতে অধীর প্রতীক্ষায় এদেশের মানুষ। ভারতী মায়েদের চোখে একেকটি অকুতোভয় বীরদর্পী সন্তান প্রসবের স্বপ্ন। তখনই অশান্ত কালের বুকে, বিপ্লবী পুরুষ আশরাফ আলীর জন্ম। ফুটফুটে সুন্দর দেহাবয়ব নিয়ে ১৩৩৩ বাংলার ১৪ অগ্রহায়ণ বুধবার দিনগত রাতে সিলেটের বিশ্বনাথ থানাধীন গড়গাঁও গ্রামে তাঁর শুভজন্ম। জনক তাঁর অত্যন্ত বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব, এলাকার মান্যবর মুরব্বী, খোদাভীরু পুরুষ মৌলভী জাওয়াদ উল্লাহ। জননীও একজন মহিয়সী নারী হাবীবুন্নেসা, প্রসিদ্ধিতে জয়তুন বিবি। ধীরে ধীরে শারাফাত ও আখলাকের সৌন্দর্য নিয়ে বড় হতে থাকেন শিশু আশরাফ। শৈশবের চাঞ্চল্য যদিও তাকে ছাড়েনি, তবুও ভদ্রতা ছিলো তাঁর চলনে-বলনে। আর এ সব শেখা মা-বাবার কাছ থেকেই।

এ উপমহাদেশের মুসলমানেরা এককালে বৃটিশ শাসনাধীন থাকায় আপন তাহযীব-তামাদ্দুন হারাতে বসলেও বিশ শতকের শুরুতে তা আবার ঘরে ঘরে পুনরোজ্জীবিত হয়ে ওঠে। ফলে জাতিগত সংস্কৃতির আদলেই এ এলাকার মুসলমান শিশুরা গৃহপরিবেশেই প্রাথমিক দ্বীনী শিক্ষা শিখে নিতে যথেষ্ট সুবিধা পেয়ে যায়। তেমনি মাওলানা আশরাফ আলীও জীবন চলার প্রয়োজনীয় প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা শিখে নিতে সক্ষম হন বাবা-মায়ের সংশ্রবেই। আর তাও অতি অল্পবয়সে। মাত্র পাঁচ বছরের জীবন। শিশু আশরাফ যখন ছয়ে পা দেন, তখন স্থানীয় মসজিদের ইমাম গহরপুরের মৌলভী সানাউল্লাহ সাহেবের নিকট আরবী শিখতে ভর্তি হন। আরবী বর্ণমালা হতে কুরআন মাজীদ পর্যন্ত মক্তব শিক্ষা এখান থেকেই সমাপ্ত করেন। পরবর্তীতে লালাবাজারের মৌলভী আবদুল মজিদ সাহেব এ মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হলে কুরআনের দাওর ও বাংলা শিখতে শুরু করেন। সাত বছর যখন তার বয়স, তখন ভর্তি হন বিশ্বনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কিছুদিনের ভেতরেই তাঁর মেধার প্রকাশ পেলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব আবরু মিয়া ও সহকারি শিক্ষক জনাব কনাই মিয়া তাঁর ওপর একান্ত নজরদারি রাখেন। এতদোভয়ের তত্ত্বাবধানেই প্রতিটি ক্লাসে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে পঞ্চম শ্রেণী উত্তীর্ণ হন তিনি।
বয়স পা দেয় এগারোয়। দূরন্ত বালক মেধা ও বোধশক্তির প্রাবল্যে ঘর-পরিবার পাঠশালা ছেড়ে আরও বিস্তীর্ণ সুযোগ তথা দেশ-দুনিয়ার হাল-হাকীকত, হক-বাতিলের বাস্তবতা সম্পর্কেও বোধশক্তি অর্জন করে নিলেন।
তখন দেশে চলছিলো অবিরত মুক্তির আন্দোলন। এগারো বছরের দূরন্ত কিশোর আশরাফ আলী দেশের প্রেমে, জাতির টানে, রক্তের তাড়নায় যোগ দেন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে। মফস্বলের বিভিন্ন বৃটিশ বিরোধী সম্মেলনে তাঁর ছিলো সক্রিয় অংশগ্রহণ। ১৯৩৭ খৃস্টাব্দে ভারতের সংসদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস প্রতিদ্বন্ধিতা করে। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের আমীর শাইখুল আরব ওয়াল আজম আল্লামা সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রাহ. বিভিন্ন শর্ত-শরায়েতের ভিত্তিতে মুসিলমলীগের সাথে জোট বেধে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করলে সর্বত্র জমিয়ত ও মুসলিম লীগ ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। জায়গায় জায়গায় সভা-সমাবেশ হয়। ঐ সময় বিশ্বনাথ পশ্চিম বাজারে যে নির্বাচনী সভা হয়েছিলো, তাতে তিনিও অংশগ্রহণ করেন।

পাঠশালা শেষ হবার পর তিনি দ্বিধাদ্বন্ধে ভুগছিলেন, স্কুলেই পড়বেন নাকি মাদ্রাসায় ভর্তি হবেন। তবে মাদরাসা পড়ার প্রতিই তাঁর আগ্রহ ছিলো অধিক। কিন্তু আশেপাশে কোনো মাদরাসা না থাকার কারণে এবং মা-বাবা এই ছোট ছেলেটিকে দূরবর্তী মাদরাসায় দিতে না চাওয়ার কারণে কিছুদিন তাঁকে বাড়িতেই কাটাতে হলো। এই অলস সময়ে জ্ঞান পিপাসু আশরাফ আলীর যেন আর তরসইছিলো না। এ অবস্থা চলাকালীন আবরু মিয়া মাস্টার সাহেব তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে তাঁর পিতার সাথে সাক্ষাৎ করেন। ব্যাপক অনুরোধ করেন ছেলেটিকে বিশ্বনাথ রামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিতে। অবশেষে তাই হলো। তিনি রামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে গেলেন। সুচারুরূপে চালিয়ে যেতে থাকলেন লেখাপড়া। কিন্তু অর্ধবছর যেতে না যেতেই কঠিন ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন তিনি। দুই মাস চিকিৎসা চলে সিলেট শহরের ডাক্তার মনাফ মিয়ার তত্ত্বাবধানে। চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু স্কুলে আর পড়া হলোনা তাঁর। বছরটা কেটে যায় বাড়িতেই।

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন পরিচালনার মাধ্যমে এ দেশের উলামায়ে কেরাম গণমানুষের স্বপ্নের স্বাধীনতা এনে দিতে বদ্ধপরিকর হন। তখন ১৮৬৬ সালে ময়দানের আন্দোলনকে আপাতত বিরতি দিয়ে শুরু করেন নীরব ও কৌশলগত বিপ্লবের কাজ। প্রতিষ্ঠা করেন দারুল উলূম দেওবন্দ। এই দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতি গণমানুষের অকৃতিম শ্রদ্ধা ও ভক্তিপূর্ণ সম্পর্কের কারণেই মুসলিম সন্তানদের হৃদয়ে পুঞ্জিভূত হতে থাকে ধীরে ধীরে কওমী মাদরাসা প্রীতি। বিশ্বনাথী দেখতে থাকেন স্বাধীনতাকামী মুক্তিপাগল উলামায়ে কেরামের সংশ্রব লাভের স্বপ্ন।

 

ইতোমধ্যেই বিশ্বনাথের দৌলতপুরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে একটি কওমী মাদরাসা। প্রতিষ্ঠাতা হলেন মৌলভীবাজার জেলার ইটা পরগনার মাওলানা আব্দুল কাদির রাহ.। দৌলতপুর কওমী মাদরাসায় তিনি উর্দু কায়দা থেকে শুরু করে ফার্সী ও উর্দু সাহিত্যের প্রাথমিক কিতাবাদি তথা মাদরাসার ইবতেদায়ী বিভাগ শেষ করেন। সেখানে তার উস্তাদ ছিলেন মাওলানা আব্দুল গণী মীরেরচরী, মাওলানা সিকান্দার আলী মুকিগঞ্জী প্রমুখ।
এমনই কাটে বাল্যকাল ও প্রাথমিক শিক্ষা জীবন।

 

মাধ্যমিক শিক্ষা জীবন:
প্রথমিক শিক্ষা শেষ হলো, কিন্তু নিম্নমাধ্যমিক কোন ব্যবস্থাও অত্র এলাকায় নেই। বাধ্য হয়েই পিতা ছেলেকে সিলেটের বড় কোনো মাদরাসায় ভর্তি করে দিতে মনস্থ করেন। জগন্নাথপুরের পাটলীর মাওলানা নূরুল গণী সাহেবের সাথে তাঁর পিতার ছিলো ভালো সম্পর্ক। মাওলানাকে অনুরোধ জানালে তিনি তাকে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাণাপিং মাদরাসায় সাফেলা ২য় বর্ষে ভর্তি করে দেন। বয়স তখন তাঁর চৌদ্দ বছর। সিলেটের মাদারিসে কওমীয়ার (আল্লাহ মাদরাসাটিকে হেফাজত রাখুন) সূচনার অধ্যায় রাণাপিং মাদরাসাকে ছেড়ে রচনা সম্ভব নয়। তখনকার প্রসিদ্ধ ও বৃহৎ মাদরাসা ছিলো ওটাই। বিশ্বনাথী রাহ. সেখানে মিশকাত জামাত (ফজিলত ২য়) পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। তৎকালে রাণাপিং মাদরাসার মুহতামিম ছিলেন মাওলানা মুস্তাকিম আলী সাহেব। সেখানে যাঁদের কাছে তিনি ইলমে দ্বীন শিক্ষা লাভ করেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন পীরে কামিল আল্লামা রিয়াছত আলী চকরিয়ার সাহেব রাহ., মাওলানা তাহির আলী তইপুরী রাহ., মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা শামসুল ইসলাম শেরপুরী, মাওলানা আব্দুর রশীদ টুকেরবাজারী, বিখ্যাত বুজুর্গ আল্লামা আবদুল মতিন চৌধুরী শায়খে ফুলবাড়ী রাহ.সহ আরও অনেক।

মিশকাত শেষ হলে পরে মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ জামাআত দাওরাতুল হাদীস পড়তে হবে। কিন্তু তৎপর্যন্ত সিলেটে কোনো টাইটেল মাদরাসা প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। সিলেটের ছাত্ররা টাইটেল পাশ করার জন্য দারুল উলূম দেওবন্দ অথবা দারুল উলূম মুইনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসায় চলে যেতে হতো। বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে হযরত দেওবন্দ লেখা পড়ার সুযোগ পাননি। কিন্তু দেওবন্দেরই কৃতি সন্তানদের কাছ থেকে আপন কৃতিত্বের সনদ আনতে, ইলমুল ওয়াহীর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করতে দারুল উলূম মুইনুল ইসলাম হাটহাজারীতে দারুল হাদীসে ভর্তি হন। তিনি তখন ২২ বছরের টগবগে তরুণ। শেরে বাংলা মাওলানা ইয়াকুব সাহেব রাহ. তখন (আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রাহ. এর শাগরিদ) হাটহাজারীর শাইখুল হাদীস বিশ্বনাথীর বুখারী শরীফের উস্তাদ তিনিই।

হাটহাজারীতে তিনি যাদের কাছে হাদীসের অন্যান্য কিতাবাদী অধ্যয়ন করেন তারা হচ্ছেন, শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রাহ. ও আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রাহ. এর সুযোগ্য শাগরিদ মুজাদ্দিদে মিল্লাত আল্লামা ফয়জুল্লাহ সাহেব রাহ., আল্লামা মুফতি আহমদুল হক রাহ., আল্লামা আব্দুল কাইয়ুম রাহ., আল্লামা মুহাম্মদ আলী রাহ., আল্লামা আব্দুল আজীজ রাহ., মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা কাশ্মিরীর অন্যতম শাগরিদ হাকীমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানবী রাহ. এর বিশিষ্ট খলিফা মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব রাহ. প্রমুখ। ১৯৪৯ ঈসায়ী সনে শেষ হয় দাওরায়ে হাদীস।

পূর্ণ শিক্ষা জীবন ছিলো তাঁর কৃতিত্বে ভরপূর। দারুল হাদীসে অনন্য মেধার পরিচয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ছাত্র জীবনকে আদর্শ ছাত্র জীবন হিসাবে আমাদের সামনে রেখে গিয়েছেন। তাঁর কৃতিত্বকে খোদ হাটাহাজারী মাদরাসাও মূল্যায়ন করেছে। বিগত ছদসালা দস্তারবন্দি মহাসম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিত মাসিক মুইনুল ইসলামের বিশেষ সংখ্যায় হাটহাজারী মাদরাসার ১০০ বছরের ফারেগীনদের মধ্য হতে ১০০ জনকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কৃতিত্বের অধিকারী বলে বাছাই করা হয়েছিল। তন্মধ্যে বাবায়ে জমিয়ত মাওলানা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী রাহ.’র নাম ২৭ তম ধারাক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেষ হয় তাঁর ছাত্র জীবন। ছাত্র জীবনে লেখা পড়ার পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনের সাথেও তাঁর ছিলো যথার্থ সংশ্লিষ্টতা। ১৯৩৭ এর নিখিল ভারত নির্বাচনী কার্যক্রম, ১৯৪৭ এর রেফারেন্ডাম, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন সবগুলোতেই নির্ভীকচিত্তে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন টগবগে তরুণ আশরাফ আলী বিশ্বনাথী।
ছাত্র জীবনেই তাঁর মাঝে সুন্নাতে নববীর পূর্ণ অনুসরণ প্রতিফলিত ছিলো। “মরেঙ্গে হাম কিতাবুউ পর ওরক হোগা কাফন আপ্না” এ আপ্তবাক্য যেন বুখে ধারণ করেছিলেন। ছাত্র জীবনই যেন অগ্রীম সংবাদ দিচ্ছিলো যে, এই আশরাফ সত্যিই একদিন দেশের খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব ও উলামায়ে কেরামের নেতায় পরিণত হবেন। শেষ শিক্ষা বর্ষের দিকেই ভারত উপমহাদেশে স্বাধীনতার পতাকা আকাশ ছুঁই ছুঁই করছিলো। কোটি মানুষের বুকের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে ভারতের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরামের সাথে যতদূর সম্ভব তিনি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন।

কর্মজীবন:
দারুল উলূম মুইনুল ইসলাম হাটহাজারী জামিয়া থেকে টাইটেল পাশ করে বাড়িতে ফিরে আসলেন। ততদিনে চতুর্দিকে সুনামের সাথে প্রচার হয়ে গেছে যে, বিশ্বনাথের আশরাফ আলী নামের এক যুবক হাটহাজারী থেকে টাইটেল পাশ করে এসেছেন।

হঠাৎ একদিন মাওলানা আব্দুল হামিদ মোবারকপুরী রাহ. একটি চিঠি হাতে এসে হাজির হলেন বিশ্বনাথীর বাড়িতে। প্রেরক ডাক্তার মোর্তজা চৌধুরী। গোয়ালাবাজারের গাভুরটেকির অধিবাসী, যিনি আজীবন কওমী মাদরাসা ও মসজিদ মক্তবের পৃষ্ঠপোষকতা করে গিয়েছেন। অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন এ সবের উন্নয়নে। আলিম-উলামার নয়নের মনি হিসাবেই সিলেটের প্রতিটি দ্বীনী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ছিলো তাঁর। আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তা’লীমের প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় আমৃত্যু সাধনা করেছেন। তাঁরই উসিলায় সিলেটের কওমী মাদরাসাগুলোর শিক্ষা-দীক্ষার মান আশাতীতভাবে উন্নতি লাভ করে। ডাক্তার সাহের চিঠির বক্তব্য হচ্ছে, সিলেটের প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুস সুন্নাহ গলমুকাপন মাদরাসায় একজন শিক্ষকের প্রয়োজন। প্রস্তাব রাখা হয়েছে বিশ্বনাথীর কাছে তিনি যেন তা সাদরে গ্রহণ করেন।
শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন আর নাই করেন ডাক্তার সাহেবের সাথে তাকে সাক্ষাৎ করতে হবে। দেখা করলেন ডাক্তার সাহেবের সাথে। ডাক্তার সাহেবের জোর অনুরোধ মেনে নিলেন তিনি। যোগ দিলেন গলমুকাপন মাদরাসার শিক্ষকতায়। শুরু হলো তাঁর কর্মজীবনের পথচলা। এবার হয়ে গেলেন জাতির শ্রেষ্ঠতম শ্রেণীর সদস্য উস্তাদ।

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত তিন বছর তিনি গলমুকাপন মাদরাসায় সুনামের সাথে শিক্ষকতা করেন। সেখানে তাঁর প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মাওলানা আব্দুশ শহীদ শায়খে গলমুকাপনী, মাওলানা শামসুদ্দীন গলমুকাপনী ও বার্মিংহাম প্রবাসী মাওলানা আব্দুল আজীজ বুরুঙ্গা।

মাত্র তিন বছর সেখানে অধ্যাপনার পর প্রিয়তম পিতা অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসেন। লেগে যান পিতার খেদমতে। এটাই তো দেওবন্দ ও দেওবন্দিয়াতের শিক্ষা। নিজের কামাই রুজি ছেড়ে দিয়ে টাকা পয়সার চিন্তা না করে বাদ দিলেন কর্ম সংস্থান। মাদরাসা শিক্ষিত ব্যতীত অন্য কারো বেলায় কি এমনটা আশা করা যায়? যাই হোক চলে আসেন তিনি বাড়িতে। খিদমাতে আত্মনিয়োগ করেন অসুস্থ বাবার। এ খবর অবহিত হন তাঁর উস্তাদ শমেমর্দান চক কাসিমপুর মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা আব্দুল গণী সাহেব রাহ.। দেখা করলেন আল্লামা বিশ্বনাথীর সঙ্গে। বললেন তুমি আমার মাদরাসায় যদি শিক্ষকতায় যোগ দাও তবে বাড়ির নিকটবর্তী এলাকায় মাদরাসা থাকার দরুন বাবার খিদমতেও কোন ব্যাঘাত ঘটবে না। আবার ইলমে দ্বীনের খিদমাতও হয়ে যাবে। উস্তাদের কথায় রাজী হয়ে গেলেনতিনি। ১৯৫৪ সালে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পেলেন শমেমর্দান চককাসিমপুর মাদরাসায়। তিনি শিক্ষক থাককালীনই শমেমর্দান তাওয়াক্কুলিয়া মাদরাসাটি চক কাসিমপুরের বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়।

মাদানিয়া বিশ্বনাথের একাডেমিক ভবন

মাদানিয়া প্রতিষ্ঠা:
১৯৩২ খৃস্টাব্দে বিশ্বনাথ বাজার এলাকায় একটি কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। দু’বছর চলার পর মাদরাসাটি সরকারি হয়ে যায়। চলে যায় বৃটিশ বেনিয়া সরকারের হাতে। তাদের দান-অনুদানেই চলতে থাকে বিশ্বনাথ এম.ই মাদরাসা। ২৫ বছর এভাবেই চলে। এরপর বন্ধ হয়ে যায় সরকারি এইড। বন্ধ হয়ে যায় মাদরাসাটি।

১৯৫৮ সালে পারকুল মাদরাসা থেকে বিদায় নিয়ে আল্লামা বিশ্বনাথী মাদরাসাটিকে পুনরুজ্জীবিত করার ফিকির করতে থাকেন। আলোচনা শুরু করলেন এলাকার বিশিষ্ট মুরব্বিদের সাথে। উদ্যোগ নেয়া হলো পুনর্বার, মাদরাসাকে চালু করার। কিন্তু মতবিরোধ দেখা দিলে এ ইস্যুতে মাদরাসাটি সরকারি হবে নাকি কওমী। অবশেষ হযরতের অক্লান্ত পরিশ্রম, বিনিদ্র প্রচেষ্টা ও দীন-দরদী মানুষের সাহায্য-সহযোগিতায় সিদ্বান্ত হলো যে, মাদরাসা হবে কওমী। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৯ সালে চালু হয় মাদরাসাটি আজ যা বাংলাদেশের মানচিত্রে একটি বৃহৎ টাইটেল কওমী মাদরাসা হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। প্রতি বছর যে প্রতিষ্ঠান জন্ম দিচ্ছে বিপুল সংখ্যক আলিম হাফিজ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুহাক্কিক, মুফাক্কির, মুজাহিদ, লেখক, প্রাবন্ধিক, যুগসচেতন ব্যক্তিত্ব, সমাজের ধারক ও বাহক। মাদরাসাটি প্রথম ছিলো বিশ্বনাথ শহরের মাঝ বরাবর ক্ষীণকায় দেহ নিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটির দক্ষিণ পারে। কিছুদিন পরই নদীর উত্তর পাড়ে মনোরম পরিবেশে বিস্তৃত অঞ্চলে স্থানান্তর করা হয়। মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠা এলাকাবাসীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিষ্ঠার ফসল বলতেই হবে। তথা এলাকার কিছু মুরব্বিয়ানে কেরামের নাম উল্লেখ না করলে মাদরাসার ইতিহাসই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যারা তাদের সর্বস্ব বিলীন করে মাদরাসা স্থাপনে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁরা হচ্ছেন, চান্দসির কাপন নিবাসী মৌলভী কাছিম আলী রাহ. আতাপুর নিবাসী মাওলানা ইবরাহীম আলী রাহ. শাহজিরগাঁও নিবাসী মৌলভী খোরশেদ আলী রাহ. চান্দশীরকাপন নিবাসী জনাব আছমত আলী রাহ.।
এই জামিয়া মাদানিয়া বিশ্বনাথের উন্নতির জন্য শায়খে বিশ্বনাথী তাঁর জীবন বিলীন করে গেছেন। ১৯৫৯ থেকে আমৃত্যু তিনি মাদানিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

মাদানিয়া কাওমিয়া মহিলা মাদরাসা

মাদানিয়া মহিলা মাদরাসা:

বাংলাদেশে নারী ধর্মশিক্ষা বিস্তৃতি লাভ করেছে নিকট অতীতে। বর্তমান পর্যন্ত তা পূর্ণতা পাচ্ছে না এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠিত নারী ধর্মশিক্ষাকেন্দ্র তথা বালিকা মাদরাসাগুলো সমস্যাসংকুল পরিস্থিতিতে রয়েছে। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও এক সময় শিক্ষাদীক্ষার পথে পা বাড়াতে থাকে। কিন্তু, মেয়েদের জন্য পৃথক মাদরাসা ব্যবস্থা যথেষ্ট না থাকায় এ দেশের মেয়েরা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতিই কেবল মানোনিবেশ করার সুযোগ পায়।

শায়খে বিশ্বনাথী রাহ. এ সমস্যা নিরসনে চিন্তা ফিকির করতে থাকেন। এক সময় জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়ার পৃথক এক ভবনে মাদরাসার কার্যক্রম শুরু করেন। ২০০১ খৃস্টাব্দে হাজী আব্দুল খালিক সাহেব বেশ কিছু জমি মাদরসাতুল বানাতের জন্য দান করলে পূর্ণ পর্দার ব্যবস্থাসহ মাহিলাদের পরিচালনা, তত্ত্বাবধান ও শিক্ষকতায় জামেয়া মাদানিয়া কাওমিয়া মহিলা মাদরাসা নামে পৃথক বালিকা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। নারীজাতির উন্নয়নকল্পে অদ্যোবদী মাদরাসাটি তাঁর অবদান রেখে চলেছে। বর্তমানে পূর্ণদাওরায়ে হাদীস মাদরাসা হিসেবে মুসলিম বালিকাদের দ্বীনী ইলমের তাকাযা পূরণ করছে এটি।
বিশ্বনাথ নতুন বাজার প্রসঙ্গ
বাবায়ে জামিয়ত আল্লামা বিশ্বনাথী রাহ. যেমন ছিলেন ইলমে আমলে পরিপূর্ণ একজন আলেম ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, তেমনি ছিলেন এক সচেতন সমাজসেবক ও সমাজ উন্নয়নকর্মী। মাদারাসা, মাসজিদ, মক্তব প্রতিষ্ঠায়, যেমন ছিলেন তিনি অগ্রসেনানী, তেমনি রাস্তা-ঘাট, বাজার-হাট ও সামাজিক উন্নয়ন-স্থাপনা নির্মাণে তাঁর ছিলো, অগ্রণী ভূমিকা। বিশেষত ১৯৬১ সালে তাঁরই প্রস্তাব ও প্রচেষ্টায় স্থাপিত হয়, নদীর উত্তর পারে বিশ্বনাথ নতুন বাজার। ইতোপূর্বে এই অঞ্চলটি অত্যন্ত অবহেলিত ছিলো। বাজার স্থাপনের সাথে সাথে রাস্তাঘাট তৈরি হয়ে এ এলাকাটি অভিজাত এলাকা হয়ে ওঠে। এই ধারাবাহিকতায়ই পরবর্তীতে উপজেলা পরিষদের সকল অফিস আদালত ও উত্তর পারে স্থাপিত হয়। মূলত এসবই ছিলো বিশ্বনাথী রাহ.’র শ্রমের ফসল।

বিশ্বনাথ নতুনবাজার স্থাপনে হযরতের সাথে সক্রিয় থেকে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের মধ্য থেকে অন্যতম হলেন, কাসিমপুরের মরহুম মাস্টার আলতাফুর রহমান, রাজনগরের মরহুম হাজী তবারক আলী, মরহুম ফজলুর রহমান (মহরি) রমধানার মরহুম মুসলিম আলী, মীরের চরের মরহুম হাজী মকরম আলী প্রমুখ।
রাজনীতির ময়দানে বিশ্বনাথী

১৯৩৭ খৃস্টাব্দ। মুসলিমদের রাজনৈতিক আশ্রয় হয়তো জামিয়ত অথবা মুসলিমলীগ। অধিকাংশ হকপন্থী তখন জমিয়তের পতাকাতলে সমবেত। শাইখুল আরব ওয়াল আজম শাইখুল ইসলাম আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানী রাহ. জমিয়তের আমীর। আয়োজন হয় নিখিল ভারত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের। মাদানী রাহ. শর্তসাপেক্ষে মুসলিমলীগের সাথে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের নির্বাচনী এক্য ঘোষণা করেন। সাথে সাথে নির্বাচনী প্রচারণার কাজে স্বতস্ফুর্তভাবে অংশ নেন। এই কাজে সমগ্র ভারতবর্ষ সফর করেন। একপর্যায়ে তিনি বিশ্বনাথে আয়োজিত বিশাল নির্বাচনী জনসভায় তাশরীফ আনেন। কিশোর বিশ্বনাথী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সে সম্মেলনে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন।

১৯৪৪ সালে যখন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন প্রচণ্ডভাবে ইংরেজদের গায়ে আঘাত হানে, তখন রানাপিং মাদরাসার ছাত্রত্বাবস্থায় তিনি এ আন্দোলনে সর্বোতভাবে অংশগ্রহণ করেন। বিশ্বনাথী নিজে বলেন- চারখাই নিবাসী মাওলানা মছদ্দর আলী রাহ.’র নেতৃত্বে সিলেট কুদরত উল্লাহ জামে মসজিদ থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়েছিলো, তাতেও আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম।

১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক সংসদ নির্বাচনে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করে। প্রায় প্রতিটি আসনে নিজস্ব প্রার্থী দাঁড় করায়। মুসলিমলীগ ও কংগ্রেস নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলো। সিলেটের প্রায় প্রতিটি নির্বানচী এলাকায় জমিয়তে প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করেন। এর অংশ হিসেবে প্রার্থী ছিলেন মদন মোহন কলেজের প্রফেসর বিশ্বনাথ থানার নাচুনী নিবাসী মৌলভী শায়খ সুলাইমান খান রাহ. শায়খে বিশ্বনাথী এই নির্বাচনে কার্যক্রমেও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। রানাপিং থেকে তখন শায়খে বিশ্বনাথীকে ও বাঘা থেকে মাওলানা আবদুুর রশীদ সিরামিসিকে পাঠানো হয় বিশ্বনাথে নির্বাচনী প্রচারনার জন্য। নিজ দায়িত্বে বিশ্বনাথ বাজারে তিনি কার্যালয় স্থাপন করে কর্মকাণ্ড চালিয়ে কষ্ট মুজাহাদার সাথে বিশ্বনাথে প্রায় প্রতিটি গ্রাম চষে বেড়ান।

১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির সময় শায়খে বিশ্বনাথী মাদানী রাহ.’র জাতীয়বাদের প্রবক্তা ছিলেন। আন্দোলন করেন অখণ্ড ভারতের পক্ষে। বলতে দ্বিধা নেই। আল্লামা গহরপুরী, শায়খে কৌড়িয়াসহ সিলেট তথা বঙ্গ অঞ্চলের অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এই দর্শনের সমর্থক ছিলেন। যুবক শায়খে বিশ্বনাথী এই আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
অবশেষে খণ্ডিত হয়ে যায় ভারত। বঙ্গদেশ পড়ে পাকিস্তানের আওতায়। নাম হয় পূর্বপাকিস্তান। সিলেট অঞ্চল নিয়ে শুরু হয় লড়াই। কেউ বলেন যাবে পূর্ব পাকিস্তানে, কেউ বলেন সংযুক্ত হবে আসামের সাথে। আয়োজন হয় রেফারেন্ডামের। এই গণভোটে জমিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো পূর্বের ন্যায় ভারত পক্ষে, মুসলিমলীগ ছিলো পাকিস্তান পক্ষে। শায়খে বিশ্বনাথী গণভোটের জোয়ার জমিয়তমুখী করতে নামেন আবার আন্দোলনে এই তরুণ ছাত্রনেতা রানাপিং থেকে বিশ্বনাথ অঞ্চলের বেশ কয়েকজন ছাত্র ও রামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন নবম শ্রেণীর ছাত্র (পরবর্তী কালের নন্দিত শিক্ষক ও রামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, তাতিকোনা জাগরণ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ) তজম্মুল আলীকে সাথে নিয়ে সিলেট থেকে নৌকাযোগে বিশ্বনাথ এসে প্রচার কাজ চালান। পথিমধ্যে টুকের বাজারে তারা হামলার শিকার হন।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গঠন:

১৯১৯ সালের গঠিত জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ভারত খণ্ডের পর ১৯৫২ সনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে পাকিস্তানে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে। তখন থেকে নিয়ে ১৯৬৪ পর্যন্ত পূর্বপাকিস্তানে এর কোনো কার্যক্রম ছিলো না। পূর্বপাকিস্তানে সর্বপ্রথম সিলেটেই এর কার্যক্রম চালু হয়। এর পেছনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ছিলো যার, তিনি বাবায়ে জমিয়ত আল্লামা আশরাফ আলী শায়খে বিশ্বনাথী। ঐ বছর ১লা নভেম্বর তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সিলেট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৬৬ খৃস্টাব্দে শায়খে বিশ্বনাথী ও আল্লামা শামসুদ্দীন কাসেমীসহ সচেতন উলামায়ে কেরামের প্রচেষ্টায় পূর্ব পাকিস্তান জমিয়ত গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এই প্রেক্ষিতে সে বছর ১৬ মার্চ ঢাকার নবাববাড়ি আহসান মঞ্জিলে উলামায়ে কেরামের সম্মেলন ঘটে। পাকিস্তান থেকে আল্লামা দরখাস্তীসহ বড় বড় আলেম উলামা এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। এ সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি নির্বাচনের দায়িত্ব দেয়া হয় শায়খে বিশ্বনাথীকে। এ সম্পর্কে তাঁর ভাষ্য হলঃ ১৬ মার্চ নবাববাড়ি আহসান মঞ্জিলে পূর্বপাকিস্তান জমিয়তে উলমায়ে ইসলাম গঠন করা হয়। সকাল ৯টা হতে বেলা ১২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ১ম অধিবেশনে কমিটির প্যানেল তৈরীর ব্যাপারে আলোচনা হয়। খাজা আনিছ উল্লাহ সাহেব প্রস্তাব করলেন জমিয়তের পূর্বপাকিস্তানের আমীর সিলেট থেকেই হতে হবে। এর সমর্থনে আমীর মনোনীত করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হল। আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। এত বড় গুরুদায়িত্ব আমি কিভাবে একা আঞ্জাম দিই। সময় নিলাম, তাই উক্ত অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটল।

২য় অধিবেশন বিকাল ৩টায় শুরু হল। অনেক চিন্তা ভাবনার পর মনে পড়ল হযরত মাদানী রাহ. শায়খে কৌড়িয়াকে নয়াসড়ক মসজিদে কোন কোন সময় ইমাম করে নামায পড়তে দেখেছি। সুতরাং তিনিই এ কাজের জন্য উপযুক্ত হবেন। যেহেতু আমি হযরত শায়খে কৌড়িয়ার নাম পেশ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। বিকাল ৩ ঘটিকায় ২য় অধিবেশনে তাঁর নাম পেশ করলাম। উক্ত প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থিত হলে হযরত দরখাস্তি সাহেব সুবহানাল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ পড়তে পড়তে মুনাজাত করলেন।

শায়খে বিশ্বনাথী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ মাওলানা মুফতী মাহমুদ, মাওলানা গোলাম গৌছ হাজারভী রাহ. প্রমুখের সাথে পত্র যোগাযোগ করে এবং আল্লামা শামসুদ্দীন কাসেমী, আল্লামা আবদুল করীম শায়খে কৌড়িয়া, মাওলানা রিয়াছত আলীসহ মুরব্বিয়ানদের সাথে উভয় পাকিস্তান সফর করে সংগঠনকে মজবুত করে তুলতে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালান। ফলে ধীরে ধীরে এ সংগঠন গণমুখী হতে শুরু করে।

১৯৬৮ সনের পহেলা, দুসরা ও তেসরা মে পাকিস্তানে লাহোর অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি ছয় জনের একটি প্রতিনিধিদলসহ সে সমাবেশে যোগদান করেন। ১৯৭১ সনের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে তিনদিন ব্যাপী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নিখিল পাকিস্তান অধিবেশন চলে। এই অধিবেশনে পূর্বপাকিস্তানের ২০ জনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তিনিও ছিলেন অন্যতম।

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধপূর্ব সময়ে সংকট নিরসনে জেনারেল ইয়াহইয়ার শাসনামলে শেখ মুজিব ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে যে সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিলো, তার নিরসনের লক্ষ্যে জমিয়ত পাকিস্তানের সেক্রেটারি জেনারেল মুফতী মাহমুদ রাহ.‘র নেতৃত্বে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃব্দ শেখ মুজিব ও ইয়াহইয়া খানের সাথে আলোচনার জন্য যখন ঢাকায় এসেছিলেন, তখন ১৩ দিনব্যাপী তিনি মুফতী মাহমুদ রাহ.’র সঙ্গে থেকে আলোচনায় অংশ নেন। মাওলানা মুহিউদ্দীন খানও তখন সাথে ছিলেন।

১৯৭৫ সালে শায়খে বিশ্বনাথী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৮৮ পর্যন্ত এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। অতঃপর নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। শায়খে কৌড়িয়া ২০০১ সনে ইন্তেকাল করলে জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হয়। আমৃত্যু এ পদে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন।

বিগত আওয়ামী দুঃশাসনে দেশব্যাপী বিশেষ করে ইসলামপ্রিয় জনতা ও আলিম-উলামাগণ চরম অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ইসলামী রাজনীতি বন্ধ করে দেবার গভীর ষড়যন্ত্র, মসজিদ ও মাদরাসায় আঘাত, সরকারি ছত্রছায়ায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলাম বিরোধী এনজিও’র উত্থান, ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং বিভিন্ন কারাগারে হাজার হাজার আলিম-উলামা বন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবন-যাপন করছিলেন। বোমা হামলার অভিযোগে নিরপরাধ অসহায় আলিম-উলামা, মাদরাসার ছাত্রদের রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক লোমহর্ষক নির্যাতন চালানো হচ্ছিল। এমনি এক ভয়াবহ অবস্থায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে চারদলীয় জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য জমিয়তের কেন্দ্রীয় আমেলা ও শুরার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে জমিয়তের নীতি নির্ধারকগণ উক্ত অধিবেশনগুলোতে যোগদান করেন এবং সুচিন্তিত পরামর্শ প্রদান করেন। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের বিপরীত একটি জোটের অস্তিত্ব দেখা গিয়েছিল। যদিও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এ জোটের কোন নাম নিশানাও ছিল না। শীর্ষ নেতাদের পরস্পর দোষারোপ করতে দেখা গিয়েছে। দেশবাসী ঐ জোটকে গ্রহণ করেনি, প্রত্যাখ্যান করেছে। জোটের শরীক একটি ইসলামী দলের জনৈক নেতা হযরত বিশ্বনাথী রাহ.’র নিকট ফোন করে তাদের জোটে যাবার জন্য লোভনীয় প্রস্তাব দেন, আরো বলা হয় তিনি শীর্ষ নেতাদের একজন হবেন। মাওলানা বিশ্বনাথী রাহ. ঐ সময় জমিয়তের শুরার অধিবেশনের জন্য ঢাকা আরজাবাদ মাদরাসায় অবস্থান করছিলেন। সে দিন তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঐ নেতাকে বলেছিলেন- “এ ব্যাপারে কথা বলার দুঃসাহস কোথায় পেলে তুমি? তুমি একজন জমিয়ত নেতা। কোন বিষয়ে কথা বলতে হলে তোমার দলের প্রধানকে বলবে। আমার সাথে সাক্ষাত করবে। তোমার সাথে কোন আলোচনা না। তুমি আমার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলার অধিকার রাখ না”। হযরতের পক্ষ হতে সাড়া না পেয়ে এবং তাঁর হুংকারে ঐ নেতা ভয় পেয়ে যান।
ভারতীয় আগ্রাসন প্রতিরোধ কমিটির ঘোষিত কর্মসূচি টিপাইমুখ অভিমুখে লংমার্চ পরবর্তী বিশাল জনসমাবেশে সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করে তিনি জানিয়ে দিলেন যে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম চালিয়ে যাব। এ লংমার্চে জমিয়তের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী সর্বাত্মকভাবে অংশ গ্রহণ করেন।
জীবনের শেষ বিকেলে বাবায়ে জমিয়ত তাঁর রাজনীতির এক ঝলক বিশ্বের দরবারে প্রদর্শন করে গেছেন। ২০০৫ সালের ২রা এপ্রিল আয়োজন করেন জাতীয় সম্মেলনের। উক্ত সম্মেলনে অতিথির আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন বিশ্ববাছা নেতৃবৃন্দ। ভারত থেকে ফেদায়ে মিল্লাত আল্লামা আসআদ মাদানী (এটাই ছিলো তাঁর বাংলাদেশের শেষ সফর।) পাকিস্তান থেকে বিরোধী দলীয় প্রধান আল্লামা ফজলুর রহমান, সংসদ সদস্য মাওলানা শেরানি খান আগমন করেন।

মৃত্যুদিন পর্যন্ত তিনি ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন এবং উলামায়ে কেরামের ঐক্যের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। ২০০৫ সালে বিয়ানীবাজারের মেওয়া মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা মুনির উদ্দীন সাহেব সন্ত্রাসীর হাতে নিহত হলে দেশব্যাপী বিক্ষিপ্ত মিছিল সমাবেশ হচ্ছিলো, কিন্তু তেমন ফল দেখা যাচ্ছিলো না। বাবায়ে জমিয়ত শায়খে বিশ্বনাথী তখন আন্দোলন জোরদার করতে উলামায়ে কেরামের ঐক্যের ডাক দেন। জামিয়া মাদানিয়া কাজির বাজারে উলামা সমাবেশ আহুত হয় ১০ মে। সিদ্ধান্ত হয় ১৯ মে অনুষ্ঠিত হবে বিশাল গণজমায়েত ও বিক্ষোভ মিছিল। অবশেষে হয়ও তাই। কিন্তু ১৮ মে রাতে হঠাৎ বুকের ডান পার্শ্বে প্রচণ্ড ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি হলে তাঁকে সেন্ট্রাল ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ফলে ১৯ মের সমাবেশে যোগ দিতে পারেননি তিনি। তবু রাতে প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমান সাহেব ও উবায়দুল হক এমপি সাহেবের কাছ থেকে গণজমায়েতের খবর নিয়ে আশ্বস্ত হয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছিলেন- “যাক, আমি উলামায়ে কেরামের ঐক্য দেখতে পেলাম। আমার আশা পূর্ণ হয়েছে।”

দেশ ভ্রমণ:

ইরাক সরকারের ওয়াকফ ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে ১৯৮৭ ইংরেজি সনের ১০ই জুন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জমিয়ত নেতা মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমীর নেতৃত্বে ৬ জনের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তিনি ইরাক সফরে যান। প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন- মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী রাহ., মাওলানা মুফতি নুরুল্লাহ, মাওলানা ফজলুর রহমান কুমিল্লা, মাওলানা মুফতি ওয়াক্কাস এম.পি, মাওলানা আনোয়ার শাহ কিশোরগঞ্জী। ইরাকের ওয়াকফ ও ধর্ম মন্ত্রণালয় এর ডাইরেক্টর শায়খ আহমদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে নিয়োজিত থেকে দু’টি সরকারী গাড়ি নিয়ে ঐহিত্যমন্ডিত স্থানগুলো পরিদর্শন করান। ওয়াকফ ও ধর্মমন্ত্রী শায়খ আব্দুল্লাহর সঙ্গে তার আমন্ত্রণে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দুভাষী ছাড়াই দু দেশে পারস্পরিক বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

১৯৮৫ ঈসায়ী সনের ১৭ই অক্টোবর তিনি প্রথম বারের মত ইউরোপ ভ্রমণে যান এবং শেষ ইউরোপ ভ্রমণ করেন ২০০৩ ইংরেজি সনে। মোট ১৩ বার ইউরোপের বিভিন্ন শহর লন্ডন, বার্মিংহাম, বার্ডফোর্ড, লিভারপুল ইত্যাদি সফর করেন। তিনি ১৩৮৭ বাংলায় ১ম হজ্বের সফর করেন। চারবার পবিত্র হজ্বব্রত পালন ও একবার উমরাহ আদায়ের জন্য তিনি সর্বমোট ৫ বার সাউদিআরব সফর করে পবিত্র মক্কা ও মদীনা জিয়ারত করেন।

সাহিত্য সাংস্কৃতিক জগতে বাবায়ে জমিয়ত
শায়খে বিশ্বনাথী রাজনৈতিক জীবনে যেমন ছিলেন একজন প্রথিতযশা রাজনীতিক, তদ্রুপ নির্দ্বিধায় স্বীকার করতেন যে, উলামায়ে কেরামকে কলমযুদ্ধের ময়দানও জয় করতে হবে। তাই সর্বাত্মকভাবে তিনি বাংলা সাহিত্যচর্চায় প্রাণবান প্রচেষ্টা চালান। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করে দ্বীনের দাওয়াতী কাজ চালাতেন। তার মাদরাসার ছাত্রদেরকেও লেখালিখি তথা সাহিত্য সংস্কৃতির পথে উদ্বুদ্ধ করতেন।

রচনা:

তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। কয়েকটি হলোঃ * মওদুদী ইসলামের সংক্ষিপ্ত নমুনা (১৯৭০) * মাদরাসাতুল বানাতের পাঠ্য তালিকা (১৯৯২) * জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি (১৯৮৮) * মক্তব প্রথম পাঠ (১৯৮৩) * মুসাফিরের নামাজ (১৯৯৬) * স্মৃতির দর্পনে পূণ্যভূমি ইরাক (১৯৯৫) * এদারার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ইত্যাদি।

আল ফারুক প্রতিষ্ঠা:

ঘুনেধরা সমাজে জীবনের রাজত্ব করছে কলম। আর এ কলম শাসন করছে কতিপয় অশ্লীল ও মিথ্যুক লেখক বুদ্ধিজীবী। সঠিক সংবাদ ও পরিস্থিতি তুলে ধরার মতো পত্রিকার সংখ্যা একেবারেই নগন্য। তাই বাবায়ে জমিয়ত চিন্তা করলেন, এমন একটি পত্রিকার জন্ম দেয়া দরকার, যা অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে সর্বদা। তৈরী করবে শালীন, শীলিত ও মার্জিত শ্রেণীর লেখক প্রাবন্ধিক। তাই ১৯৯৮ সনের জুন মাসে প্রথম প্রকাশ করেন মাসিক আল-ফারুক নামে একটি সাহিত্য সাময়িকী। বর্তমানে তাঁরই ছেলে মাওলানা রশিদ আহমদ ও মাওলানা হুসাইন আহমদের তত্ত্বাবধানে মাওলানা শিব্বীর আহমদের সম্পাদনায় পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। পত্রিকাটির উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন দেশের খ্যাতিমান লেখক, প্রাবন্ধিক, গবেষক কবি মুসা আল হাফিজ।

ইন্তেকাল:
১৫ মে ২০০৫ রবিবার প্রতিদিনের মতো সালাতুল এশা আদায় করে কিছুক্ষণ মাদরাসার অফিসে বসেন। একটু পর চলে যান বাসায়। এই জামেয়া কি জানতো যে, এটাই তার বুকে শেষ আগমন, এটাই তার শেষ যাওয়া। বাসায় গিয়ে প্রচণ্ডভাবে বুকের ব্যথায় আক্রান্ত হন। সিটি ক্লিনিকে ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় নিয়ে আসা হয়। (উল্লেখ্য ৬০ এর দশকে তিনি বিশ্বনাথ নতুন বাজারে কিছু জায়গা ক্রয় করেন। ১৯৭৪ সনে সেখানে বাসা নির্মাণ করে বসবাস করতে থাকেন।

অবশেষে ১৮ মে বুধবার বুকের ডান পার্শে প্রচন্ড ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি হলে আবার সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৯ মে বৃহস্পতিবার ক্লিনিকের ডাক্তাররা অপারগতা প্রকাশ করলে রাত ২টা ৩০ মিনিটের দিকে সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর আর অবস্থার উন্নতি হয়নি। ৮টা ৩০ মিনিটের সময় অসংখ্য অগণিত ভক্তকুল, উলামায়ে কেরাম, রাজনৈতিক কর্মী, ও ছাত্রদেরকে কাঁদিয়ে পরম প্রভূর সান্নিধ্যে চলে যাবার উদ্দেশ্যে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

স্ত্রী ও সন্তানাদী

তিনি ১৯৫৩ খৃস্টাব্দে গলমুকাপন নিবাসী হাজী আবদুল গণী সাহেবের প্রথমা কন্যা বেগম লুৎফুন্নেসা তুহফাকে শাদী করেন। তাঁর গর্ভে জন্ম নেন ১৩ জন ছেলে মেয়ে। ১৯৮১ সনের ২৮ আগস্ট প্রিয়তমা আহলিয়া মুহতারামা ইন্তেকাল করলে ছোট ছোট ৩ জন সন্তানের লালন পালন নিয়ে গভীর চিন্তায় পড়ে যান। তাই অনন্যোপায় হয়ে ১৯৮২ এর জানুয়ারিতে সদর থানার রুস্তমপুরের জনাব আবদুল হান্নান চৌধুরীর কন্যা রহিমা বেগমকে ২য় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। এ পক্ষের মোট ছেলে মেয়ে ৬ জন।
৮ ছেলে, ১১ মেয়ে, মোট ১৯ জন। ১মা স্ত্রী: মরহুমা মোছাম্মৎ লুৎফুন্নেছা তুহফা এর কোলেÑ ১. মাওলানা রশিদ আহমদ, সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি, মাসিক আল-ফারুক। ২. মোছাম্মৎ আয়েশা খাতুন, স্বামী: সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর থানার অন্তর্গত শেওড়া গ্রামের মুফতী হাফিজ শরীফ উদ্দীন, ৩. আলহাজ্ব হাফিজ হোসাইন আহমদ, লন্ডন প্রবাসী সাধারণ সম্পাদক মাদানিয়া ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। ৪. মোছাম্মৎ রাবিয়া খাতুন, স্বামী: সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার হায়দারপুর গ্রামের মাওলানা বশীর আহমদ, মুহাদ্দিস জামেয়া মাদানিয়া বিশ্বনাথ। ৫. মোছাম্মৎ রাহিমা খাতুন, স্বামী: সিলেট সদর থানার আলমপুর গ্রামের সৈয়দ উদ্দীন আহমদ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। ৬. মাওলানা শিব্বীর আহমদ, মুহতামিম- জামেয়া মাদানিয়া বিশ্বনাথ। ৭. যুবায়ের আহমদ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। ৮. মোছাম্মৎ হাফসা খাতুন, স্বামী: বিশ্বনাথ থানার দশঘর গ্রামের মাওলানা জালাল উদ্দীন, লন্ডন প্রবাসী। ৯. মোছাম্মৎ হাবিবা খাতুন, স্বামী: সিলেট সদর থানার বলদী গ্রামের শামীম আহমদ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। ১০. মোছাম্মৎ হাফিজা খাতুন, স্বামী: বালাগঞ্জ থানার বুরুঙ্গা গ্রামের ইউসুফ আহমদ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী।
১১. মুহাম্মদ ফরিদ আহমদ, বিশিষ্ঠ ব্যবশায়ী সাউদিআরব প্রবাসী। ১২. মোছাম্মৎ মাশকুরা খাতুন, স্বামী: হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ থানার অন্তর্গত গজনাইপুর গ্রামের মুহাম্মদ এমদাদুল হক খান, লন্ডন প্রবাসী।
২য় স্ত্রীঃ মোছাম্মৎ রহিমা বেগম এর কোলেÑ ১৪. মাওলানা ফখরুদ্দীন আহমদ, লন্ডন প্রবাসী। ১৫. মোছাম্মৎ মাহফুজা খাতুন, স্বামী: জগন্নাথপুর থানার পাটলী মিনহাজপুর গ্রামের এনামুল হক (রাজু), লন্ডন প্রবাসী। ১৬. মোছাম্মৎ মাউসুফা খাতুন। ১৭. মোছাম্মৎ মাসউদ আহমদ (ফাহিম)। ১৮. মোছাম্মৎ মামদুহা খাতুন। ১৯. মুহাম্মদ মুহসিন উদ্দীন (নাঈম)।

মাদানিয়া মাদরাসা মসজিদ, বিশ্বনাথ

শেষ কথা
দেশের এ প্রথিতযশা আলিমে দ্বীন, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, বরেণ্য বুজুর্গ, তুখোড় রাজনীতিবিদ, সফল গ্রন্থকার ও লেখক, বাবায়ে জমিয়ত আল্লামা আশরাফ আলী শায়খে বিশ্বনাথী ছিলেন প্রচন্ড ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর শারীরিক আকৃতি ছিলো উঁচু ও বলিষ্ঠকায়, ঘন কেশবিশিষ্ট শির, দেখতে যেন একজন বীর বাহাদুর সৈনিক। মাথার শিরস্ত্রাণে মুজাহিদের প্রতিকৃতি বিমূর্ত হতো। তাঁর দর্শনে ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধার উদ্রেক হতো। কিন্তু আলাপচারিতায় ও সদাসয় অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হতেন সবাই। আমল আখলাকে সদা ছিলেন সুন্নাতে নববীর সঠিক অনুসারী। দ্বীনী ও আধুনিক সংঘাতপূর্ণ বিষয়াবলীতে ছিলো তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। তাঁর বড় সাধ ও স্বপ্ন ছিলো আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েম হোক এবং সে জন্য উলামায়ে কেরাম তথা ইসলামী চিন্তাবিদগণ একই প্লাটফর্মে দাঁড়াক। আজ জমিয়তের দিকে তাকালে মনে পড়ে বাবায়ে জমিয়তের কথা, জামিয়া মাদানিয়ার দিকে তাকালে অন্তরে জাগ্রত হয় তাঁর অবদান।

এগিয়ে চলুক তাঁরই সুযোগ্য সন্তান মাওলানা শিব্বীর আহমদের হাত ধরে তাঁর আপ্রাণ চেষ্টার ফসল দ্বীনী দারসগাহ জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া বিশ্বনাথ। বাংলার জমিনে বুলন্দ হোক ইসলামী রাজনীতির হাত ধরে আল্লাহর নাম। ঐক্যবদ্ধ হোন উলামায়ে কেরাম।

লেখক: মীম সুফিয়ান।

Share.

লেখক পরিচিতি

mm

Leave A Reply

Top