কুরবানি করা ওয়াজিব নাকি সুন্নাত? কার কার উপর কুরবানির বিধান?

0

কুরবানি অতি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। প্রতিবছর যিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ “কুরবানির ঈদ বা ঈদুল আযহা” পালন করা হয়। প্রকৃতপক্ষে কুরবানির ইতিহাস ততোটাই প্রাচীন যতটা প্রাচীন দ্বীন-ধর্ম অথবা মানবজাতির ইতিহাস। মানবজাতির জন্যে আল্লাহ তায়ালা’র পক্ষ থেকে যতো শরীয়ত নাযিল হয়েছে, প্রত্যেক শরীয়তের মধ্যে কুরবানি করার বিধান ছিল। প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতে এটা ছিল একটা অপরিহার্য অংশ।

আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكاً لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ.

অর্থ: আর আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানির এক রীতি-পদ্ধতি নির্ধারণ করেছি, যেন তারা ঐসব পশুর উপর আল্লাহর নাম নিতে পারে। যে সব তিনি তাদেরকে দান করেছেন। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৩৪)

 

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা যামাখশারী রাহ. বলেন,

شرع الله لكل أمة أن ينسكوا له: أي يذبحوا لوجهه على وجه التقرب

অর্থাৎ আদম আ. থেকে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত প্রত্যেক জাতিকে আল্লাহ তা’য়ালা তার নৈকট্য লাভের জন্য কুরবানির বিধান দিয়েছেন। (তাফসীরে কাশশাফ:  ২/৩৩)

 

তবে হযরত আদম আ. এর যুগে কুরবানি থাকলেও তা আদায়ের পন্থা আমাদের মতো ছিলো না। শরীয়তে মুহাম্মাদির কুরবানি মিল্লাতে ইবরাহীমীর সুন্নাত। এটি শা’আইরে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত।

 

শাব্দিক অর্থ: কুরবানি শব্দের উৎপত্তি আরবি “قرب” হতে। এর অর্থ কোনও বস্তুর নৈকট্য লাভ করা। قُرْبَانٌ শব্দটি “قرب” হতে মুবালাগার সীগাহ। ইমাম রাগিব ইস্ফাহানী রাহ. তাঁর ‘মুফরাদাতুল কুরআনে’ কুরবানির অর্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: কুরবানি ওই বস্তুকে বলে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করা যায়। আল ক্বামুসুল মুহীতে বলা হয়েছেـ

ما يُتَقَرَّب به إلى الله تعالى.

অর্থাৎ যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা’র নৈকট্য লাভ করা যায়।

পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় ঈদুল আযহার নামাজের পরে আল্লাহ তায়ালা’র সন্তুষ্টির লক্ষ্যে পশু জবাই করাকে কুরবানি বলা হয়।

 

কুরবানির মর্যাদা: কুরবানি অত্যন্ত পছন্দনীয় এবং মক্ববুল আমল, এই ব্যাপারে ফুক্বাহায়ে কেরাম একমত। হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে: উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَال “‏ مَا عَمِلَ آدَمِيٌّ مِنْ عَمَلٍ يَوْمَ النَّحْرِ أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ إِنَّهَا لَتَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِقُرُونِهَا وَأَشْعَارِهَا وَأَظْلاَفِهَا وَإِنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللَّهِ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ مِنَ الأَرْضِ فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا ‏‏

অর্থাৎ কুরবানির দিনের আমল সমূহের মধ্য থেকে পশু কুরবানির চেয়ে অন্য কোনো আমল আল্লাহ তায়ালার নিকট অধিক প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন এই কুরবানিকে তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কুরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহ তায়ালার নিকট কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কুরবানি করো। (তিরমিযী শরীফ: ১৪৯৯)

 

অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে:

مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ، وَلَمْ يُضَحِّ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا

অর্থ: যার কুরবানির সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।

(মুস্তাদরাকে হাকিম: ৩৫১৯; আত-তারগীব ওয়াত তারহীব: ২/১৫৫)

 

কুরবানির বিধান: কুরবানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, এই ব্যাপারে একমত হওয়া সত্ত্বেও ফুক্বাহায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ হয়ে গেছে যে, কুরবানি ওয়াজিব নাকি সুন্নাত?

ইবনে রুশদ বিদায়াতুল মুজতাহিদের মধ্যে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম মালিক ও ইমাম শাফিয়ী রাহিমাহুমাল্লাহ’র মতে কুরবানি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। অবশ্য ইমাম মালিক রাহ.–এর একটি মত ওয়াজিব হবার পক্ষেও পাওয়া যায়।

ইমাম আবু হানিফা ও মুহাম্মাদ রাহিমাহুমাল্লাহ’র মতে কুরবানি ওয়াজিব। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ও আবু ইউসুফ রাহিমাহুমাল্লাহ–হতে ওয়াজিব ও সুন্নাত উভয় মতামত পাওয়া যায়। হানাফি মাযহাবের চূড়ান্ত ফতোয়া হচ্ছে, সামর্থ্যবানদের উপর কুরবানি ওয়াজিব।

 

কুরআনে কারীম ও আহাদিসে রাসূলে কুরবানি ওয়াজিব হবার অসংখ্য দলীল পাওয়া যায়। আমরা সংক্ষেপে কয়েকটি উল্লেখ করছি।

(১) আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারীমে বলেন:

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

আপনি আপনার প্রতিপালকের জন্য নামাজ পড়ুন এবং কুরবানি করুন। (সূরা কাওসার, আয়াত: ২)

উক্ত সূরায় প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে কাউসার নিয়ামতের সুসংবাদ প্রদান করে কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য দু’টো বিষয় নির্দেশ করেছেন।

 

البدن ونحر النحر يوم صلاة ,الحسن قال

হাসান বসরী রাহ. বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য ঈদের নামাজ ও ইদের দিনের কুরবানি। (তাফসীরে তাবারী। ১২ নং খন্ড, ৭২৩ পৃষ্ঠা। এ’লাউস সুনান। ১৭ নং খণ্ড, ২১৯ পৃষ্ঠা)

“وَانْحَرْ” -এর ব্যাখ্যায় সালাফে সালিহীন হতে অনেক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তন্মধ্যে রাঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. সহ বহুসংখ্যক মুফাসসির কুরবানি অর্থটি গ্রহণ করেছেন। তাঁরা বলেন, আল্লাহ তায়ালা “وَانْحَرْ”  বলে কুরবানির নির্দেশ দিয়েছেন। (তাফসীরে তাবারী। ১২ নং খন্ড, ৭২২ পৃষ্ঠা)

আরবি ভাষায় আমর এর সীগাহ কোনো শর্ত ব্যতীত আসলে উজূব বা আবশ্যক অর্থে ব্যবহৃত হয়। (উসূলুল বাযদাভী। ১৪৩ পৃষ্ঠা।)

 

অতএব “وَانْحَرْ” এর ভিন্ন অর্থ কেউ কেউ গ্রহণ করলেও কুরবানি অর্থটি সর্বাধিক অগ্রাধিকার-প্রাপ্ত। এলাউস সুনানেও বলা হয়েছে: যেভাবে “ﻔﺼﻞ ﻟﺮﺑﻚ” দ্বারা ঈদের নামাজ ওয়াজিব প্রমাণিত হয়, একইভাবে “وَانْحَرْ” দ্বারা কুরবানি ওয়াজিব প্রমাণিত হয়।

 

(২) নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ، وَلَمْ يُضَحِّ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا

অর্থ: যার কুরবানির সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে। (মুস্তাদরাকে হাকিম: ৩৫১৯; আত-তারগীব ওয়াত তারহীব: ২/১৫৫; মুসনাদে আহমাদ: ২/৩২১; ইবনে মাজা; বাবুল আযাহী।)

 

উক্ত হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানির সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা কুরবানি করবে না, তাদের কঠোরভাবে ঈদগাহে আসতে নিষেধ করেছেন। এমন কঠোরতা সাধারণত ওয়াজিব পরিত্যাগ করার কারণেই হয়ে থাকে।

 

(৩) জুনদুব ইবনে সুফিয়ান রা. বলেন, আমি কুরবানির দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। তিনি বললেন, যে ব্যক্তি নামাযের পূর্বে যবেহ করেছে সে যেন আবার অন্য স্থানে যবেহ করে। আর যে যবেহ করেনি সে যেন যবেহ করে।

عن جندب بن سفيان قال: شهدت النبي صلى الله عليه وسلم يوم النحر قال: «من ذبح قبل أن يصلي فليعد مكانها أخرى، ومن لم يذبح فليذبح.» [رواه البخاري]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য হাদিসে বলেছেন: কেউ যদি ঈদের নামাযের পূর্বে কুরবানি করে নেয়, তবে তাকে ওই পশুর পরিবর্তে নতুনকরে কুরবানি করতে হবে। আর কুরবানি ঈদুল আযহার নামাযের পরে বিসমিল্লাহ বলে করা উচিৎ। (সহিহ বুখারি; কিতাবুল আযাহী।)

আমাদের দলীল হচ্ছে, যদি কুরবানি ওয়াজিব না হতো, তবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল আযহার নামাযের পূর্বে কুরবানি করলে পুনরায় নতুন করে আদায়ের নির্দেশ প্রদান করতেন না।

 

(৪) নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফার ময়দানে দাড়িয়ে বলেছিলেন, হে মানুষ! প্রত্যেক বছর প্রত্যেক ঘরের বাসিন্দাদের জন্য একটি কুরবানি করা জরুরী।

«يا أيها الناس: إن على كل أهل بيت في كل عام أضحية »

(মুসনাদে আহমাদ: ২/২১৫)

 

(৫) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও কুরবানি করেছেন। হাদীসে এসেছে,

«وَنَحَرَ النَّبِى صلى الله عليه وسلم بِيَدِهِ سَبْعَ بُدْنٍ قِيَامًا».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে সাতটি উট দাঁড়ানো অবস্থায় নহর (যবেহ) করলেন। (সহিহ বুখারি: ১৭১২)

 

(৬) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন :

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ أَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِالْمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ يُضَحِّي ‏

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ বছর মদিনা মুনাওয়ারায় অবস্থান করেছিলেন। ওই অবস্থানকালীন সময়ে তিনি নিয়মিত কুরবানি করতেন। (সুনানুত তিরমিযী: ১/১৮২)

 

(১) যারা বলেন, কুরবানি সুন্নাত, তাঁদের দলিল হচ্ছে:

إِذَا رَأَيْتُمْ هِلَالَ ذِي الْحِجَّةِ، وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ، فَلْيُمْسِكْ عَنْ شَعْرِهِ وَأَظْفَارِهِ.

 

অর্থ: তোমাদের মাঝে যে কুরবানি করতে চায়, যিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর সে যেন কুরবানি সম্পন্ন করার আগে তার কোনো চুল ও নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭; তিরমিযী: ১৫২৩)

 

এ হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘যে কুরবানি করতে চায়’ বলে কুরবানিকে ব্যক্তির ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। আর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত বিষয় ওয়াজিব হতে পারে না।

 

(২) অন্যত্র এসেছে, হযরত আবু বকর ও হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা মানুষের উপর ওয়াজিব হয়ে যাবে, এই আশঙ্কায় কুরবানি করতেন না।

 

তাদের প্রথম দলিলের জবাব: আমরা বলি, ইরাদা বা ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত হওয়াটা ওয়াজিব না হবার দলিল হয় না। যেমন, হাদিসে এসেছে: যে জুময়া পড়তে চায় সে যেন গোসল করে আর যে হজ্ব করতে চায় সে যেন দ্রুত তা আদায় করে নেয়। এখানে জুময়া ও হজ্বের সাথে ইচ্ছাকে যুক্ত করা হয়েছে। অথচ হজ্ব ও জুময়া ফরয ইবাদত।

 

দ্বিতীয় দলিলের জবাব: হযরত আবু বকর ও হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমার কুরবানি না করার কারণ ছিলো, প্রতিবছর কুরবানি দেয়ার মতো সামর্থ্য তাঁদের ছিলো না। তাঁদের উপর কুরবানি ওয়াজিবও ছিলো না৷ নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই তো কুরবানি ওয়াজিব হয়৷ তাঁরা তো বায়তুল মাল থেকে প্রয়োজন অনুপাতে ভাতা নিয়ে জীবনযাপন করতেন।

 

অতএব উপরোল্লিখিত দলীলের আলোকে বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, কুরবানি ওয়াজিব। কুরবানি ঐচ্ছিক কোনো আমল নয়৷ আমাদের সমাজে কতিপয় লোক কুরবানি সুন্নাত বলে সামর্থ্যবানদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিচ্ছেন৷ বিষয়টি তেমন নয়৷ কুরবানি সামর্থ্যবানদের উপর ওয়াজিব৷ এই হুকুম কুরআন-সুন্নাহর দলিলের মাধ্যমেই সুসাব্যস্ত৷ তাই প্রত্যেক সামর্থ্যবানের উচিত কুরবানি করা।

 

কুরবানি ওয়াজিব হবার শর্তসমূহ:-

 

(১) কুরবানিসহ যে কোন ইবাদতের ক্ষেত্রে মুসলমান হওয়া পূর্বশর্ত। দলীল:

لأنها قربة. والكافر ليس من اهل القرب

(বাদায়েউস সানায়ে)

মুসলমান বলতে উদ্দেশ্য হল, যে ব্যক্তি তাওহিদে বিশ্বাস করে আল্লাহকে রব হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রাসূল বলে স্বীকার করে আর ইসলামকে একমাত্র দ্বীন বলে মনে-প্রাণে গ্রহণ করে। অবিশ্বাসীর যাবতীয় ইবাদত প্রত্যাখ্যাত। অবিশ্বাসীদের কোন ইবাদতই আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

 

وَقَدِمْنَا إِلَىٰ مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَّنثُورًا

 

অর্থ: তারা যেসব কাজ করেছে, আমি তার দিকে মনোনিবেশ করবো, তারপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবো। (সুরা ফুরকান: ২৩)

 

(২) স্বাধীন হওয়া। দলীল:

لأن العبد لا يملك.

(আল বাহরুর রাঈক্ব)

যেহেতু গোলাম কোনো বস্তুর মালিক নয়, তার উপর কুরবানি কীভাবে ওয়াজিব হবে?

 

(৩) শরীয়তের দৃষ্টিতে মুকাল্লাফ বা ইবাদতের উপযুক্ত হওয়া। এরদ্বারা উদ্দেশ্য প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ-মস্তিষ্ক সম্পন্ন হওয়া। অতএব নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, এমন মানুষ নিসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানি ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানি করলে তা সহীহ হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার: ৬/৩১৬)

 

(৪) মুক্বীম বা নিজগৃহে অবস্থানকারী হওয়া। অতএব হানাফি মাযহাবে মুসাফিররে উপর কুরবানি ওয়াজিব নয়।

দলিল: হযরত আলী রাযি. বলেন:

ليس على المسافر أضحية

মুসাফিরের উপর কুরবানি নেই। (আল মুহাল্লা বিল আসার লি ইবনি হাজাম রাহ.)

 

(৫) সামর্থ্যবান অর্থাৎ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। অতএব প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর হতে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রয়োজন অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবেন, তার উপর কুরবানি ওয়াজিব।

দলিল:

مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ، وَلَمْ يُضَحِّ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا

(সুনানু ইবনি মাজা। বাবুল আযাহী)

এই হাদিসের দ্বারা জানা যায় যে, কুরবানির জন্য সামর্থ্যবান হওয়া জরুরি।

 

যাকাতের ক্ষেত্রে নিসাব পরিমাণ সম্পদের উপর বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত। কিন্তু সদকাতুল ফিতর কিংবা কুরবানির জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদের উপর বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। (বাদায়েউস সানায়ে: ৫/৬৪)

আমাদের জেনে রাখা উচিত, কুরআনে কারীম ও হাদিসে পাকে অনেক হুকুম মুজমাল বা অতি সংক্ষেপ বর্ণনা করা হয়েছে। ফুক্বাহায়ে কেরাম পরবর্তীতে এর ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। যেমন হজ্বের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে সে যেন হজ্ব করে। এখন সামর্থ্যের মাপকাঠি নির্ধারণ জরুরী। নতুবা প্রত্যেকে নিজের মতো করে অপব্যাখ্যা করবে। একইভাবে কুরবানির ক্ষেত্রেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম বলেছেন “যে ব্যক্তি সামর্থ্যবান……” ফুক্বাহায়ে কেরামের সামর্থ্যের ব্যাখ্যা নির্ধারণ করেছেন ‘যে ব্যক্তির উপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব। ওই ব্যক্তির উপর কুরবানিও ওয়াজিব।’

 

কুরবানির নিসাব: আর নিসাব হলো স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত ভরি আর রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন ভরি। টাকা পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হলো সাড়ে সাত ভরি সোনা কিংবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া।

টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বর্তমানে বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়ীক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানির নিসাবের ক্ষেত্রে হিসাব-যোগ্য।

সোনা-রূপা কিংবা অন্য কোনও সম্পদ যদি এককভাবে নিসাব পরিমাণ না থাকে, কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে নিসাব পরিমাণ হয়ে যায়, তাহলে তার উপর কুরবানি করা ওয়াজিব। যেমন কারও কাছে কিছু স্বর্ণ আছ। আবার কিছু নগদ টাকা আছে। সবমিলিয়ে যদি তা নিসাব পরিমাণে পৌঁছে যায়, তবে তাকে কুরবানি করতে হবে।

 

আপনার নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে কিনা তা হিসেব করতে পারেন এভাবে:

(১) আপনার মালিকানায় থাকা স্বর্ণের বর্তমান বিক্রয়মূল্য।

(২) আপনার মালিকানায় থাকা রূপার বর্তমান বিক্রয়মূল্য।

(৩) আপনার হাতে থাকা দৈনন্দিন খরচের অতিরিক্ত ক্যাশ টাকা, ডিপোজিট, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদি।

(৪) আপনার বসবাসের বাড়ি ছাড়া অন্যান্য ফ্ল্যাট বা বাসাবাড়ির বিক্রয়মূল্য।

(৫) এমনসব সম্পদ,যেগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য নয়। বরং সম্পদ হিসেবে আমরা জমা করে থাকি। এগুলোর বিক্রয়মূল্য।

এভাবে সবগুলোর মূল্য যদি সাড়ে সাত ভরি সোনা কিংবা সাড়ে ৫২ ভরি রূপার সমমূল্য হয়ে যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে আপনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক। তবে মিশ্রিত সম্পদের ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার মূল্যই মাপকাঠি ধরতে হবে৷

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দ্বীন বুঝে দ্বীনের উপর আমল করার তাওফিক দান করুন।

 

লেখক: হাফিয মাওলানা মাসুম আহমাদ

মুহাদ্দিস: জামেয়া আব্বাসিয়া কৌড়িয়া, সিলেট

সদস্য: সিয়ানাহ ট্রাস্ট

Share.

লেখক পরিচিতি

Leave A Reply

Top