কুরবানী সহীহ হওয়ার ক্ষেত্রে কুরবানীদাতার অবস্থানস্থল ধর্তব্য নাকি কুরবানীর পশুর অবস্থানস্থল ধর্তব্য?

0

মূল বিষয়টি আলোচনার আগে যে জিনিসটি আমাদের বুঝতে হবে সেটি হচ্ছে কুরবানির আবশ্যকতা কিভাবে এসেছে? আমরা যদি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর মুখ নিঃসৃত হাদিসটি দেখি যেখানে বিশ্বনবী সাঃ কুরবানির আবশ্যকতা সম্পর্কে বলেন-
مَنْ وَجَدَ سَعَةً فَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا
অর্থাৎ স্বচ্ছলতা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানি করে নি, সে যেনো আমাদের ঈদগাহে না আসে। (মুসনাদে আহমদ, মুস্তাদরাকে হাকিম)

সমস্ত ফুকাহায়ে কিরাম এ ব্যাপারে একমত যে এখানে ‘স্বচ্ছলতা’ বলতে কুরবানির দিনগুলোতে স্বচ্ছলতা অর্জন উদ্দেশ্য। অতএব, এই দিনগুলোতে যিনি আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জন করবেন তার উপরই কুরবানি ওয়াজিব হবে।

এবার আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়ে আসি।
কুরবানি সহীহ হওয়ার ক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কিরামের বক্তব্য থেকে আমরা যা বুঝতে পাই তা হলো, তারিখের ক্ষেত্রে কুরবানি দাতার অবস্থানস্থল ধর্তব্য এবং সময়ের ক্ষেত্রে কুরবানীর পশুর অবস্থানস্থল ধর্তব্য। এর কারণ হলো, কুরবানিদাতার উপর কুরবানি ওয়াজিব হয় তখন যখন তিনি ১০ যিলহজ্ব সুবহে সাদিকের সময় থেকে নিয়ে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত আর্থিকভাবে শরয়ী মানদণ্ডে সামর্থ্যবান থাকবেন। যখন কুরবানি দাতার উপর কুরবানি ওয়াজিব হয়ে গেলো, তখন দেখতে হবে পশুটি কোন জায়গায় অবস্থান করছে। যদি সেটি শহরে থাকে তবে ঈদুল আযহার দিন ঈদের নামাজের পরে কুরবানি করতে হবে। আর যদি গ্রামে থাকে (এখানে গ্রাম বলতে এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলকে বুঝানো হচ্ছে যেখানে ঈদের নামাজ কিংবা জুময়ার নামাজ পড়া হয় না, শহরের সাথে এই অঞ্চলের খুব একটা সম্পর্ক থাকে না) তাহলে সুবহে সাদিকের পরেই কুরবানি দেয়া শুদ্ধ হয়ে যাবে। যেমনিভাবে হিদায়া কিতাবে এসেছে,
ثم المعتبر فی ذالک مکان الاضحية
অর্থাৎ, কুরবানির পশুর অবস্থানই হলো ধর্তব্য।

কুরবানি সহিহ হওয়ার জন্য কুরবানি করার স্থান ধর্তব্য৷ অর্থাৎ যে জায়গায় কুরবানির পশু জবাই করা হবে, ওখানে ১২ যিলহজ্বের সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত কুরবানি করা সহিহ হবে৷ মানে প্রবাসী ব্যক্তি যে দেশে থাকবে, সে দেশে যদি কুরবানি করার নির্দিষ্ট দিনগুলো অতিক্রম করে যায় অর্থাৎ ১৩ যিলহজ্ব চলে আসে, তবুও নিজ দেশে অর্থাৎ কুরবানি করার স্থানে যদি যিলহজ্ব মাসের ১১ বা ১২ তম তারিখ থাকে, তাহলে কুরবানি সহিহ হবে৷ কেননা কুরবানি যেখানে আদায় করা হচ্ছে, সেখানে তো আইয়্যামে নাহর থাকছে৷
ويعتبر مكان المذبوح لا مكان المالك… ولوكان هو في مصر وقت الأضحية وأهله في مصر آخر فكتب إلي الأهل وأمرهم بالتضحية في ظاهر الرواية يعتبر مكان الأضحة. (خانية زكريا: ٣/٢٤٣)
والمعتبر مكان الأضحية لا مكان المضحي. (البحر الرائق: ٨/٣١٧)

উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, যদি কোনো দেশের তারিখ অগ্রবর্তী হয় এবং ঐ দেশের নাগরিক এমন কোন দেশ যেখানে তারিখ পশ্চাদবর্তী-সে দেশের কাউকে প্রতিনিধি বানায় কুরবানির জন্য, তখন পশ্চাদবর্তী দেশের ১০ই যিলহজ্ব সুবহে সাদিকের আগে কুরবানি করলে তা জায়েয হবে না। কারণ এখানে কুরবানি করার সময়ই আসে নি। এখানে কুরবানি করার স্থান উদ্দেশ্য। যেহেতু এই স্থানে কুরবানির সময়ই হয় নি সেহেতু নির্ধারিত সময়ের আগে কুরবানি দিলে তা সহীহ হবে না। যেমন কেউ ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশের কাউকে তার প্রতিনিধি বানালো।

অন্যদিকে যদি পশ্চাদবর্তী তারিখের কোন দেশের কেউ অগ্রবর্তী তারিখের কোন দেশের কাউকে তার কুরবানি করার জন্য প্রতিনিধি বানায় তবে ঐ পশ্চাদবর্তী তারিখের দেশে ১০ই যিলহজ্ব সুবহে সাদিক আসার আগে অগ্রবর্তী দেশে তার জন্য (প্রতিনিধির মাধ্যমে) কুরবানি করা সহীহ হবে না। কারণ এখানে কুরবানি দাতার উপর তখন পর্যন্ত কুরবানি ওয়াজিবই হয় নি। যেমন বাংলাদেশের কেউ ইংল্যান্ডের কাউকে কুরবানি করার জন্য প্রতিনিধি বানালো। এখানে কিন্তু কুরবানি দাতার অবস্থান উদ্দেশ্য।

পরিশেষে এটাই বলি, কুরবানি আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে একটি প্রেমময় ইবাদত৷ আমাদের জন্য বিশেষ নিয়ামত। কেননা এই পশু কুরবানির মাধ্যমে আমরা আমাদের আমিত্বের কুরবানি দিতে সচেষ্ট হতে পারি। তাক্বওয়ার পথে নিজেকে পরিচালনার ভিত রচনা করতে পারি। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে শরীয়াহ মোতাবেক কুরবানি পালনের তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক: হাফিয মাওলানা আসআদ বিন সিরাজ
ইমাম ও খতিব: উপশহর ই-ব্লক বায়তুন নাজাত জামে মসজিদ, সিলেট৷
সদস্য: সিয়ানাহ ট্রাস্ট।

Share.

লেখক পরিচিতি

Leave A Reply

Top