সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে যিকিরের ব্যাপারে শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি

0

সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে যিকিরের ব্যাপারে শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি

জিয়াউর রহমান

যিকির সম্পর্কিত কুরআন ও হাদীসের দলীলসমূহ পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, ঢালাওভাবে সশব্দে সম্মিলিত যিকিরের উপর গুরুত্বারোপ করা যাবে না, আবার ঢালাওভাবে সম্মিলিত যিকিরকে বিদআতও বলা যাবে না৷ বরং অনুচ্চস্বরে যিকিরের বিষয়টিই পবিত্র কুরআনে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত৷ ইরশাদ হচ্ছে-

وَاذْكُرْ رَبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُوِّ وَالْآَصَالِ وَلَا تَكُنْ مِنَ الْغَافِلِينَ

অর্থ: তোমরা প্রতিপালককে মনে মনে সবিনয় ও সশংকচিত্তে অনুচ্চস্বরে প্রত্যুষে ও সন্ধ্যায় স্মরণ করবে এবং তুমি উদাসীন হবে না। (সুরা আরাফ: ২০৫)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার যিকির বা স্মরণের কয়েকটি নিয়ম অতি সংক্ষেপে বলা হয়েছে৷ তন্মধ্যে অনুচ্চস্বরে যিকিরের কথাও এসেছে৷ অধিকহারে আল্লাহ তাআলার যিকির করা অনেক সওয়াব এবং ফযীলতের কাজ৷ তবে শরীয়তে যিকিরের কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বা তরীকা আবশ্যকীয় নয়৷ এজন্যে সম্মিলিত যিকিরের মজলিসে বসার উপর কাউকে জোর-জবরদস্তি করা যাবে না৷ কেউ শরীক না হলে তাকে হেয়’র নজরে দেখা যাবে না৷

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا
অর্থ: হে ঈমানদারগণ, তোমরা বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করো৷ (সূরা আহযাব: ৪১)

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي، وَأَنَا مَعَهُ إِذَا ذَكَرَنِي، فَإِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ ذَكَرْتُهُ فِي نَفْسِي، وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي مَلَأٍ ذَكَرْتُهُ فِي مَلَأٍ خَيْرٍ مِنْهُمْ.
অর্থ: বান্দা আমার প্রতি যেরূপ ধারণা পোষণ করে, আমিও তার সাথে সেরূপ মুয়ামালা করে থাকি। বান্দা যখন আমার যিকির করে তখন আমি তার সাথে থাকি। সে যদি আমাকে মনে মনে স্মরণ করে, তাহলে আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। সে যদি আমাকে কোনো বৈঠকে স্মরণ করে, তাহলে আমিও তাকে এমন বৈঠকে স্মরণ করি যেটি তাদের চেয়ে আরও উত্তম। (বুখারী: ৭৪০৫ ও মুসলিম: ২৬৭৫)

আবূ মূসা আশ‘আরী রা, বর্ণনা করেন: আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথেই ছিলাম। আমরা প্রত্যেকে উঁচু স্থানে উঠার সময় এবং ঐ উপত্যকায় অবতরণের সময় উচ্চস্বরে তাকবীর ধ্বনি করতে করতে যাচ্ছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট এসে বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أرْبعُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ؛ فإنَّكم لَا تَدْعُونَ أَصَمَّ وَلَا غَائِبًا، إِنَّهُ مَعَكُمْ، إِنَّهُ سَمِيعٌ قَرِيبٌ.

অর্থ: হে লোকসকল! নিজেদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করো। তোমরা কোন বধির বা অনুপস্থিত কাউকে ডাকছো না। নিশ্চয় তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। তিনি অতিশয় শ্রবণকারী, নিকটবর্তী৷ (বুখারী: ৯২২৯ ও মুসলিম:২৭০৪)

তাছাড়া আরো হাদিসে এসেছে-

خَيْرُ الذِّكْرِ الْخَفِيُّ
সর্বোত্তম যিকির হচ্ছে, নিরবে করা৷ (আহমদ, ইবনে হিব্বান)

তবে শরীয়তের পরিপূর্ণ অনুসারী কোনো কামিল বুযুর্গ যদি তাঁর শিষ্যদের ইসলাহ এবং তারবিয়াতের জন্যে কোনো জায়গায় যিকিরের মজলিস কায়েম করেন, যেখানে অন্য ইবাদতকারীদের ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটে, নতুন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করা না হয়, তাহলে এটা জায়েয আছে কোনো সমস্যা নেই৷ কিন্তু অনির্ভরযোগ্য কোনো নামধারী পীর যদি এমন প্রথাগত কোনো যিকিরের মজলিস কায়েম করেন, যেখানে শরীয়তের কোনো পাবন্দী থাকে না, অংশগ্রহণ না করলে হেয় করা হয়, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয় বা জবরদস্তি করা হয়, বা অন্য ইবাদতকারীর ইবাদতে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে এমন যিকিরের মজলিস কায়েম করা একেবারেই জায়েয নয়৷

ইবনে মাসউদ রা, এরকম শরীয়তবিবর্জিত এক যিকিরের মজলিসের সবাইকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন৷ মসজিদ থেকে বের করে দিয়েছিলেন৷ (শামী: ৯/৫৭০)

عن ابن مسعود رضى الله عنه أنه أخرج جماعة من المسجد يهللون ويصلون على النبى صلى الله عليه وسلم جهرا وقال لهم: ما أراكم إلا مبتدعين الخ، هل يكره رفع الصوت بالذكر والدعاء؟ قيل نعم!
(شامى زكريا: ٩/٥٧٠)
ইবনে আব্বাস রা, থেকে বর্ণিত আছে যে, মানুষ যখন ফরয নামায শেষ করে ফিরে যায়, তখন উচ্চস্বরে যিকির করার প্রচলন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ছিল৷ (মুসলিম: ১/২১৭, আবু দাউদ: ১/১৪৪)
إن أبا معبد مولى ابن عباس أخبره أن رفع الصوت للذكر حين ينصرف الناس من المكتوبة كان ذالك على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم. وأن ابن عباس رضى الله عنهما قال: كنت أعلم إذا انصرفوا بذالك وأسمعه.
(رواه مسلم: ١/٢١٧ و أبو داود: ١/١٤٤)

উপরে দুই রকমের রেওয়ায়াত থেকে বোঝা গেলো, দলিল উভয়দিকেই আছে৷ সম্মিলিত যিকিরের অনুকূলেও দলিল আছে, এর বিপরীতেও আছে৷ তাই নিয়ন্ত্রিত, অনিয়মিত, সংযত এবং স্থান-কাল-পাত্রভেদে সম্মিলিত যিকিরের মজলিস হওয়া চাই৷

সুতরাং এ সকল দলিলের আলোকে উলামায়ে কেরামের গবেষণালব্ধ বক্তব্য হচ্ছে, যিকিরের বেলায় জ্বালী অথবা খাফী তথা উচ্চস্বরে হোক বা অনুচ্চস্বরে, উভয় নিয়মেই জায়েয আছে৷ ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোনটি উত্তম আর কোনটি অনুত্তম, তা নির্ণিত হবে ওই অবস্থার আলোকে৷ তবে উচ্চস্বরে যিকিরের বেলায় কয়েকটি শর্ত বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য:-

১. এই পদ্ধতির যিকিরকে একমাত্র লক্ষ্য ও মূখ্য ইবাদত মনে না করা৷ বরং এটাকে মাকসূদ তথা লক্ষে পৌঁছার এবং নফসের অনুশীলনের মাধ্যম হিসেবে নেয়া৷

২. যে ব্যক্তি যিকিরের মজলিসে অংশ না নেয়, তাকে ভর্ৎসনা করা, হেয়মূলক কথা এবং মন্দ বলা যাবে না৷

৩. মসজিদ অথবা উন্মুক্ত জায়গায় সম্মিলিতভাবে উচ্চস্বরে যিকিরের কারণে যেহেতু প্রবল আশঙ্কা থাকে যে, লোকেরা এটাকে আবশ্যিক এবং মৌলিক ইবাদত মনে করে নিতে পারে, তাই ঘরে কিংবা বিশেষ কোনো জায়গায় যিকিরের মজলিস কায়েম করা যেতে পারে৷ উন্মুক্ত জায়গায় নয়৷

৪. মসজিদ অথবা এমন কোনো জায়গায় উচ্চস্বরে যিকির করা যাবে না, যেখানে ইবাদতকারী কিংবা জনসাধারণের সমস্যা হয়, অসুবিধা সৃষ্টির আশঙ্কা হয়৷

৫. যিকিরের মজলিসে খানার ইন্তেজাম করাকে জরুরি মনে না করা এবং এর জন্যে সবার কাছ থেকে উন্মুক্তভাবে চাঁদা উঠানোর ব্যবস্থা না করা৷

৬. এই যিকির রিয়া বা লোকদেখানো উদ্দেশ্যে না হওয়া৷

এই কয়েকটি দিক লক্ষ্য রেখে সশব্দে যিকির জায়েয আছে, চাহে তা সম্মিলিতভাবে হালকাবন্দী হয়ে হউক বা কাতারবন্দী হয়ে৷ তবে একাকী এবং অনুচ্চস্বরে যিকির করাটাই উত্তম৷ কুরআন, হাদীস এবং ফুকাহায়ে কেরামের ভাষ্যে এমনটাই বোঝা যায়৷ তাছাড়া যিকিরের নামে লাফালাফি, চিৎকার-চেঁচামেচি এগুলো সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়৷ স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে এসব করার অনুমতিও নেই৷

উল্লেখ্য: আমাদের কিছু ভাই আছেন, যারা সম্মিলিত যিকিরের কঠোর বিরোধিতা করেন৷ ঢালাওভাবে বিদআত ফতোয়া দেন৷ হারাম সাব্যস্ত করেন৷ বাহ্যত তাদের এই বিরোধিতা যিকির ‘সম্মিলিত’ এবং ‘সশব্দে’ হওয়ার কারণেই৷ প্রথমত সম্মিলিত যিকির ঢালাওভাবে বিদআত কিংবা হারাম ফতোয়া দেয়ার সুযোগ নেই৷ যেহেতু দলিল উভয়দিকেই আছে৷ যা ইতোপূর্বে আলোচনা হয়েছে৷ তবে বিশেষ অবস্থার আলোকে নাজায়েযের পর্যায়ে চলে যেতে পারে৷ কিন্তু সবসময় নয়৷

কিন্তু আফসোসের কথা হচ্ছে, যারা ঢালাওভাবে সম্মিলিত ও সশব্দে যিকিরের বিরোধিতাকারী, তাদেরকে একাকি ও নিশব্দে যিকিরের ব্যাপারেও খুব উদাসীন দেখা যায়৷ অথচ সম্মিলিত ও সশব্দে যিকিরের ব্যাপারে কথা থাকলেও একাকি যিকিরের ব্যাপারে তো কোনো মতানৈক্য নেই৷ রাসূলের তরীকা মানতে গিয়ে যদি সম্মিলিত যিকিরের বিরোধিতা করা হয়ে থাকে, তাহলে তো রাসূলের তরীকার উপর আমল করতে গিয়ে সবসময় যবানে যিকির জারি থাকার কথা৷ কেননা হাদীসে এসেছে-
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، يَذْكُرُ اللَّهَ عَلَى كُلِّ أَحْيَانِهِ.
(رواه مسلم: ٣٧٣)
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারাক্ষণ আল্লাহ তাআলার যিকিরে মাশগূল থাকতেন৷ (মুসলিম: ৩৭৩)

তাই বিরোধিতার আগে বিবেকের সঙ্গে একটু বোঝাপড়ার অনুরোধ রইল যে, আমি সম্মিলিত যিকিরের বিরোধিতা করি কী উদ্দেশ্যে? আমার উদ্দেশ্য ভালো? না বিরোধি পক্ষ হওয়ার কারণেই বিরোধিতা? আমার যবানে কত সময় আল্লাহর যিকির জারি থাকে? প্রতিদিন কী পরিমাণ যিকির করি? মনের সাথে একটু বোঝাপড়ার অনুরোধ রইল৷ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সারাক্ষণ তাঁর যিকির করার সৌভাগ্য নসীব করুন৷ আমীন৷

তথ্যসূত্র:
১. আল-কুরআন
২. সহীহ বুখারী,
৩. সহীহ মুসলিম,
৪. সুনানে আবী দাউদ,
৫. মিশকাতুল মাসাবীহ,
৬. রদ্দুল মুহতার,
৭. ইমদাদুল ফাতাওয়া,
৮. আযীযুল ফাতাওয়া,
৯. ফাতাওয়ায়ে উসমানী,
১০. কিতাবুন নাওয়াযিল৷

লেখক: মুফতি জিয়াউর রহমান
পরিচালক: সিয়ানাহ ট্রাস্ট
ও ইসলামিক ফিকহ ইনস্টিটিউট

Share.

লেখক পরিচিতি

mm

Leave A Reply

Top