সর্বস্তরের মুসলমানদের জন্যে দীন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

0

সর্বস্তরের মুসলমানদের জন্যে দীন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

মুফতি জিয়াউর রহমান

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই কুরআনকে সর্বস্তরের মানুষের হেদায়াতের আলোকবর্তিকা হিসেবে নাযিল করেছেন৷ রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন সমস্ত মানুষের হেদায়াতের জন্যে কুরআনের আমলি রূপ হিসেবে৷ কুরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা কোথাও সমস্ত মানবজাতিকে সম্বোধন করেছেন৷ কোথাও ঈমানদারদের সম্বোধন করেছেন৷ এখান থেকেই কুরআনি সম্বোধনের ব্যাপকতার বিষয়টি অনুধাবন করা যায়৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানবজাতিকে সম্বোধন করা হয়েছে ইসলামের ঝাণ্ডার নিচে আশ্রয় গ্রহণের জন্য৷ আর ঈমানদারদের সম্বোধন করা হয়েছে ঈমান আনয়ন-পরবর্তি করণীয় সমঝিয়ে দেওয়ার জন্যে৷

একজন মানুষ যখন ঈমানদার হবে৷ মুসলিম পরিচয়ে পরিচিত হবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার উপর ইসলামের যাবতীয় বিধিবিধান আরোপিত হয়ে যাবে৷ পুরো জীবন পরিচালনার একটি নীতিমালা তার সামনে চলে আসবে৷ কারণ ইসলামে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ জীবনের রূপরেখা৷ অন্য সকল মতবাদ থেকে নিজের সম্পর্কহীনতার মাধ্যমে একজন মুমিনের ইসলামে প্রবেশ পূর্ণতা পাবে৷ একজন মুমিন তখনই ইসলামি বিধিবিধান ও নিয়মের ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করবে৷ আর এই বিধিবিধান মতে নিজেকে পরিচালনা করে দুনিয়া ও আখেরাতে কামিয়াব হওয়ার পূর্বশর্ত হলো, দীনী ইলম অর্জন করা৷ কারণ দীনের শিক্ষা ব্যতিত ইসলামের বিধিবিধান মেনে চলা সম্ভব নয়৷ আর ইসলামের বিধিবিধান মতো নিজেকে পরিচালনা করতে না পারলে দুনিয়া ও আখেরাতে কামিয়াব হওয়াও সুদূরপরাহত বিষয়৷

আদমশুমারি মতে বাংলাদেশের ৮৫ ভাগ মানুষ মুসলমান৷ কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এই বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠির মধ্যে ১০ ভাগ মুসলিম পাওয়া যাবে না যারা দীনের মৌলিক বিষয়াবলী সম্পর্কে অবগত৷ ইসলামি আকিদা সম্পর্কে স্বচ্ছ জ্ঞান রাখে৷ শরীয়তের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে ধারণা রাখে৷ ১০ ভাগ মুসলিম পাওয়া যাবে কী না সন্দেহ, যারা দুই রাকাত নামায সহীহ হওয়া পরিমাণ কুরআনের সুরা এবং আয়াত বিশুদ্ধভাবে পড়তে পারে৷ আরো বড় পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এই বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠির মধ্যে ১০ ভাগও এমন মুসলিম পাওয়া যাবে না, যারা পাঁচওয়াক্ত নামায যথাযথভাবে আদায় করে৷ নামাযের প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসাইল জানে৷ শতকরা প্রায় ৯৮ ভাগ মানুষ এমন রয়েছে, যারা হালাল-হারাম, জায়েয-নাজায়েয সম্পর্কে কোনোই ধারণা রাখে না৷ শরয়ী ইলমের ছিটেফোঁটাও তাদের মধ্যে নেই৷ মানুষ যে ইলমি শূন্যতায় ভুগছে, তারা যে জানার দৈন্যতায় ভুগছে, সেই অনুভূতিও তাদের মধ্যে নেই৷ মানুষ জানে না যে, সেটাও তারা জানে না৷

অতীতের প্রত্যেক জাতি যখনই জাহিলিয়াতের পথে অগ্রসর হয়েছে, দীনের শিক্ষা থেকে বিমুখ থেকেছে, মুর্খতা তাদের গ্রাস করেছে, তখনই আল্লাহ তাআলা তাদের নিকট নবি পাঠিয়ে সেই জাতিকে জাহিলিয়াতের অন্ধকার থেকে আলোর পথে এনেছেন৷ দীনের শিক্ষার মাধ্যমে তাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করেছেন৷ আজ আমাদের মাঝে নবি নেই৷ আর কোনো নবি আসবেনও না৷ কিন্তু উম্মাহকে জাহিলিয়াতের অন্ধকার থেকে বের করে আনতে হবে৷ দীনের শিক্ষা দ্বারা জীবন সমৃদ্ধ করতে হবে৷

প্রত্যেক মুসলিম নর-নারির জন্যে দীনি ইলম অর্জন করা ফরয হওয়ার বিবরণ

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে কারিমে সেদিকে নির্দেশনা প্রদান করেছেন৷ ইরশাদ হচ্ছে-
فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ
তারপর তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দীনের জ্ঞান লাভ করে এবং আপন সম্প্রদায় যখন তাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে, তখন তাদেরকে সতর্ক করতে পারে, যাতে তারা (গোনাহ থেকে) বেঁচে থাকে। (সুরা তাওবা: ১২২)

হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে-
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ.
দীনি ইলম অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। (ইবনু মাজাহ: ২২৪; মিশকাত: ২১৮)
এখানে বা হাদিসের কিতাবের অন্যান্য স্থানে যে ইলম অর্জনের কথা বলা হয়েছে, তার অর্থ হলো, দীনি ইলম৷ তাই ‘ইলম’ দ্বারা দীনি ইলমই এখানে উদ্দেশ্য৷ যদিও অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় দুনিয়াবী জ্ঞান-বিজ্ঞানও মানুষের জন্যে জরুরি৷ কিন্তু হাদিসসমূহে সেসবের ফযিলত বর্ণিত হয় নি৷

ফরয ইলম দুই প্রকার: ফরযে আইন ও ফরযে কিফায়া৷

ফরযে আইন: ওই পরিমাণ ইলম যা সবার জন্য শেখা ফরয বা জরুরি৷ ঈমানের মৌলিক বিষয়াবলী ও ইসলামের বিশুদ্ধ আকিদার জ্ঞান হাসিল করা৷ নামাযের প্রয়োজনীয় মাসাইল৷ ওযু শেখা ও ভঙ্গ হওয়ার কারণগুলো জানা৷ নামায সহীহ হওয়া পরিমাণ কুরআন বিশুদ্ধভাবে তিলাওয়াত শেখা৷ রোযার প্রয়োজনীয় মাসাইল শেখা৷ রোযা ভঙ্গ হওয়ার কারণসমূহ জানা৷ নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে যাকাতের মাসআলাগুলো জানা৷ কীভাবে ও কখন যাকাত আদায় করতে হয়৷ কাকে যাকাত দেওয়া যায়৷ কী কী মালের উপর যাকাত আসে ইত্যাদি৷ হজ্ব কখন ফরয হয়, কার উপর ফরয হয়৷ হজ্ব আদায়ের যাবতীয় বিধিবিধান জানা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারির জন্যে ফরযে আইন৷

অনুরূপভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য, কেনা-বেচা বা শিল্প-কারখানায় নিয়োজিত ব্যক্তির জন্যে সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান জেনে রাখা৷ দাম্পত্য জীবন শুরু করতে যাচ্ছে, এমন ব্যক্তির জন্যে বিয়ে ও তালাকের মাসআলা-মাসাইল ও পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে শরীয়তের জ্ঞান হাসিল করা ফরয৷ এক কথায় শরীয়ত মানুষের উপর যেসব কাজ ফরয বা ওয়াজিব করে দিয়েছে, সেগুলোর হুকুম-আহকাম ও মাসআলা-মাসাইল সম্পর্কে জ্ঞান হাসিল করা প্রত্যেক নর-নারির জন্যে ফরয৷

ফরযে কিফায়া ইলম:

কুরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞান লাভ করা৷ তাফসির ও উসুলুত তাফসির, হাদিস ও উসুলুল হাদিস, ফিকহ ও উসুলুল ফিকহ, কুরআন-হাদিস থেকে আহরিত শরীয়তের হুকুম-আহকাম ও তার অসংখ্য শাখা-প্রশাখা আয়ত্তে আনা সকল মুসলিমের পক্ষে সম্ভবও নয় এবং ফরযে আইনও নয়৷ তবে গোটা মুসলিম উম্মাহর জন্যে তা ফরযে কিফায়া৷ উম্মাহর খাস খাস ব্যক্তিগণ শরীয়তের এই সমস্ত বিষয়ের উপর উচ্চতর ইলম অর্জন করে পুরো উম্মতের প্রয়োজন মিটিয়ে নেওয়ার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন হলেই ফরযে কিফায়া ইলমের যিম্মাদারি আদায় হয়ে যায়৷

তাফসিরে মা’আরেফুল কুরআনে তার একটি রূপরেখা এরকম দেয়া হয়েছে: প্রত্যেক শহরে যদি শরীয়তের উপরোক্ত ইলম ও আইন-কানুনের একজন সুদক্ষ আলেম থাকেন, তবে অন্যান্য মুসলমান এ ফরযের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি লাভ করতে পারে৷ কিন্তু যদি শহর বা পল্লীতে একজনও অভিজ্ঞ আলেম না থাকেন, তবে তাদের কাউকেই আলেম বানানো বা অন্যখান থেকে কোনো আলেমকে ডেকে এনে এখানে রাখার ব্যবস্থা করা স্থানীয় লোকের পক্ষে ফরয৷ যাতে করে যে কোনো প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসাইল সম্পর্কে তার কাছ থেকে ফতোয়া নিয়ে সে মতো আমল করা যায়৷ (মা’আরিফ, সুরা তাওবা: ১২২)

মোটকথা ইসলামী আদব-আখলাক, দ্বীনের বোধ ও চেতনা, দ্বীনের প্রতি দরদ ও মহব্বত প্রভৃতি বিষয়। এ শিক্ষা এজন্যে জরুরি যে, এতে সে ধীরে ধীরে দ্বীনমনষ্ক ও ইসলামীবোধসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারবে। ঈমান ও তাকওয়ার চেতনায় উজ্জীবিত হবে। জীবনাচরণে ন্যায় ও সততার পরিচয় দিতে সক্ষম হবে। দায়িত্ববান ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে৷

ইলমে দীনের ফযিলত সম্বলিত কিছু আয়াত ও হাদিস

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ

অর্থ: তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিবেন বহুগুণ। (সূরা মুজাদালা: ১১)
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে-
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
অর্থ: বলুন! যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? (সুরা যুমার: ৯)

অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে-
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
অর্থ: আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানিরাই কেবল তাঁকে ভয় করে৷ (সুরা ফাতির: ২৮)

যাদের ভেতর দীনের প্রকৃত শিক্ষা রয়েছে, তারা আল্লাহকে ভয় করবে এটাই স্বাভাবিক৷ তাই তো দীনের শিক্ষা এত বড় এক সম্পদ, যা হাসিল করলে আল্লাহর ভয় অন্তরে প্রবেশ করে৷ তাকওয়া অর্জিত হয়৷ আর প্রকৃত মুত্তাকি হওয়া একজন মুমিনের সবচে বড় কামিয়াবি৷ জীবনের লালিত স্বপ্ন৷

হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে-
مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا رِضًا لِطَالِبِ الْعِلْمِ، وَإِنَّ طَالِبَ الْعِلْمِ يَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ حَتَّى الْحِيتَانِ فِي الْمَاءِ.

অর্থ: যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণের জন্য বের হয় আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন। ফেরেশতারা তার সম্মানে নিজেদের পাখা বিছিয়ে দেয়। আলেমের জন্য আসমান-জমিনের সবাই দু‘আ করতে থাকে। এমনকি সাগর ও খাল-বিলের মাছও তার জন্য দু‘আ করতে থাকে। (মুসলিম: ২৬৯৯, তিরমিযি: ২৬৪৬)

إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
অর্থ: যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়। তিনটি আমল ব্যতীত। এই তিনটি আমল হল: সাদাকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং এমন সুসন্তান যে তার জন্য দুআ করে। (মুসলিম: ১৬৩১)

مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ.
অর্থ: আল্লাহ যার কল্যাণ চান তিনি তাকে দীন বিষয়ে গভীর ইলম দান করেন। (বুখারি: ৭১ মুসলিম: ১০৩৭)

خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ.
অর্থ: তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে কুরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়। (সহিহ বুখারি: ৫০২৭)

مَن خرَج في طَلَبِ العِلمِ، كان في سَبيلِ اللَّهِ حَتَّى يرجِعَ.
অর্থ: যে ইলম অনুসন্ধানে বের হয় সে ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় থাকে। (জামে তিরমিযি ২/৯৩)

তবে দ্বীনী ইলমের উপরোক্ত ফযীলত লাভের জন্য শর্ত হল : ইখলাছ। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই ইলম অর্জন করতে হবে। পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে তা অর্জন করা যাবে না। পার্থিব সুনাম-সুখ্যাতির উদ্দেশ্যে দ্বীনী ইলম অর্জন করা হলে তার পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

নৈশ মাদরাসা কেন?

জেনারেল শিক্ষিত, কলেজ-ভার্সিটির ছাত্র-শিক্ষক, ব্যবসায়ি, চাকুরিজীবী ও কর্মব্যস্তদের মধ্যে বিরাট বড় একটি অংশ পাওয়া যাবে, যারা ছোটবেলা কুরআন শিখেন নাই বা শিখলেও ভুলে গেছেন৷ নামায সহিহ হওয়া পরিমাণ শুদ্ধ করে কুরআন তিলাওয়াত জানেন না৷ নামায-রোযাসহ জরুরি বিষয়াবলির মাসআলা-মাসাইল জানেন না৷ নিয়মতান্ত্রিকভাবে অ্যাকাডেমিক দীনি শিক্ষা অর্জনেরও সুযোগ নেই৷ তাদের জন্যেই মূলত নৈশ মাদরাসার এই নতুন ধারা৷

আসলে এই যুগের জন্যে নতুন ধারা হলেও বয়স্কদের দীন শেখার ধারা তো একটি আদি ও ঐতিহ্যবাহি পদ্ধতি৷ সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাতে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তারা তো প্রায় সকলেই বয়স্ক ছিলেন৷ অ্যাকাডেমিক শিক্ষালাভের বয়স পেরিয়ে এসেছিলেন৷ ইসলাম গ্রহণের পর সবাই রাসূল ﷺ এর কাছে দীন শিখেছেন৷ ইসলামের বিধিবিধান আহরণ করেছেন৷ তাহলে বোঝা গেলো, বয়স্কদের দীন শেখার ধারাটাই আদি এবং আসল৷ ইসলামের মূল স্পিরিট এবং চেতনা নিয়েই তারা দীনের ইলম অর্জন করেন৷

যারা হতাশায় ভুগেন এই বয়সে এসে দীন শিখতে পারব কী না কুরআন শুদ্ধ করতে পারব কী না, তারা সাহাবায়ে কেরামকে আদর্শ হিসেবে নিতে পারেন৷ তাঁরা কিন্তু বয়স্ক থেকেই দীন শিখেছেন৷ দিনের বেলা কর্মব্যস্ত থাকলে বিকেলে এসে মসজিদে নববিতে দীনের শিক্ষা অর্জন করতেন৷ বস্তুত নৈশ মাদরাসার এই শিক্ষাপদ্ধতি রাসূল ﷺ যুগের সুফফার শিক্ষাপদ্ধতির নতুন রূপায়ণ৷ নৈশ মাদরাসার তালিবুল ইলম ভাইয়েরা হলেন আসহাবে সুফফার বাস্তব নমুনা৷ সুতরাং সাহাবাওয়ালা সেই বরকতময় ধারাটি পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্কদের দীন শেখার এই সিস্টেম নতুন করে চালুর মাধ্যমে৷

উপসংহার
প্রত্যেক সচেতন অভিভাবক সন্তানের ভবিষ্যতের প্রতি লক্ষ রেখে তার পেছনে অনেক সময় দেন৷ তার শিক্ষা-দীক্ষা থেকে নিয়ে সব ক্ষেত্রে প্রচুর পরিশ্রম এবং খাটুনি খাটেন৷ কারণ একটাই, তার ভবিষ্যত সুন্দর হওয়া চাই৷ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের প্রত্যেকের জন্যে ভবিষ্যত রেখে দিয়েছেন৷ সেটাই আসল জীবন৷ অনন্তর পরকালীন ভবিষ্যত আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে৷ সেই ভবিষ্যত সুন্দর করতে হলে দীনি শিক্ষার বিকল্প নেই৷ দীনি ইলম পরিশুদ্ধ আমলের পূর্বশর্ত৷ দীন না শিখলে আমল বিশুদ্ধ হবে না৷ আমল বিশুদ্ধ না হলে পরকালীন নাজাতও পাওয়া যাবে না৷

ইসলাম-পূর্ব যুগটা জাহিলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলো৷ মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ নবুওয়াত লাভ করলেন৷ হয়ে গেলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ৷ বরকতময় রিসালাতের মাধ্যমে যে ঘন অন্ধকার দূরীভূত হলো, সেই রিসালাতের প্রথম বাক্য ছিলো إقرأ৷ মানে পড়৷ জিবরিল একাধারে তিনবার এই বাক্য বলার জন্যে রাসূলকে বললেন৷ রাসূল বললেন, আমি তো পড়তে জানি না৷ তারপর বুকের বুক লাগিয়ে চাপ দিলেন৷ ইলমে ওহির ফল্গুধারা প্রবাহিত হওয়া শুরু হলো৷ পুরো দুনিয়া উজ্জ্বল হয়ে গেলো৷ নতুন সূর্যোদয় হলো৷

আবারও জাহিলিয়াতের অন্ধকারে ছেয়ে গেছে গোটা সমাজ৷ কারণ একটাই; আমরা ওহির শিক্ষা থেকে দূরে সরে গেছি৷ নবুওয়তের দরোজা তো বন্ধ৷ কিন্তু ওহীর শিক্ষা আমাদের মাঝে বিদ্যমান৷ সেই শিক্ষার আলো জ্বালিয়েই জাহিলিয়াতের অন্ধকার দূরীভূত করতে হবে৷ সর্বস্তরের মুসলমানদের অন্তরে দীনের মশাল প্রজ্বলিত হলেই সকল অন্ধকার দূরীভূত হবে৷ সকল জাহিলিয়াতের মূলোৎপাটন হবে৷

লেখক: মুফতি জিয়াউর রহমান
পরিচালক: সিয়ানাহ ট্রাস্ট
ও ইসলামিক ফিকহ ইনস্টিটিউট

Share.

লেখক পরিচিতি

mm

Leave A Reply

Top