জুমার বয়ান। বিষয় : কিয়ামত দিবসে আল্লাহর আরশের ছায়ার নিচে আশ্রয়প্রাপ্ত দলের বিবরণ

0

তারিখ : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯. ১৩ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী।

نحمده ونصلی علی رسوله الکریم. اما بعد ،اعوذ بالله من الشیطان الرجیم، بسم الله الرحمن الرحیم.
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ.
وعن أبي هريرة رضی الله تعالی عنه قالَ: قالَ رسُولُ اللَّه ﷺ: سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ في ظِلِّهِ يَوْمَ لا ظِلَّ إلَّا ظِلُّهُ: الی اخر الحدیث.
মুসল্লিয়ানে কিরাম!
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার অসংখ্য শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে আজকের এই পবিত্রতম জুম’য়ার দিনে উপনীত করেছেন। পাশাপাশি রাব্বে কারীমের আরও কৃতজ্ঞতা আদায় করছি এজন্য যে, তিনি আমাদেরকে যাবতীয় ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করে তাঁর ঘর মসজিদে আসার তাওফিক দিয়েছেন এবং সালাত পূর্ববর্তী সময়ে কিছু দ্বীনি আলোচনা শুনার সুযোগ দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ।

সম্মানিত মুসলমান ভাইগণ!
আমরা সবাই জানি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা কেনো আমাদেরকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। কুরআনে হাকীমের সুরা যারিয়াতের ৫৬ নং আয়াত পাঠ করলে আমরা জানতে পারি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আমাদেরকে পাঠিয়েছেন কেবলমাত্র তাঁরই ইবাদাত বা উপাসনার জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ইবাদাতের মাধ্যমে আমরা আসলে কী অর্জন করতে যাচ্ছি? বস্তুত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার ইবাদাতের মাধ্যমে আমরা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনপূর্বক জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম করছি। যদি ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীতে আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার ইবাদাতে না কাটাতে পারি, তাহলে কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে আমাদেরকে ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। যেদিন কেউ কারো কাজে আসবে না। ব্যক্তি তার নিজের আমল নিয়েই ওইদিন মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিবে। এজন্য একজন বুদ্ধিমান মু’মিন সে-ই হবে, যে আগামীকাল অর্থাৎ কিয়ামতের দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে পারে।

মুসল্লিয়ানে কিরাম! কিয়ামত বা হাশর একটি বিপদসংকুল পরিস্থিতির নাম। আমাদের জ্ঞান তো কেবল এতটুকুই গ্রহণ করে যে, যেহেতু আল্লাহ পাক আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদাতের জন্য। অতএব, যারা তাঁর ইবাদাত করবেন পরকালে আল্লাহ তাদেরকে পুরষ্কৃত করবেন৷ আর যারা তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে পরকালে আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নামে পাঠাবেন। ব্যস, আমরা এতটুকু বুঝেই ক্ষ্যান্ত। কিন্তু পরকালের পরিস্থিতি সত্যিই কি এত সহজ? বাস্তবেই কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা খুব স্বাভাবিকভাবেই বিচারকার্য শেষ করে নিবেন?

কুরআনে হাকীমের বিভিন্ন আয়াত, বিশ্বনবী ﷺ এর অসংখ্য হাদীস দ্বারা আমরা বুঝতে পারি ঐ দিন সত্যিকার অর্থেই একটি ভয়াবহ দিন। কুরআনে হাকীমের সুরা ইয়াসিনের ৬৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা ইরশাদ করেন: الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
“আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।”

সুরা মা’য়ারিজের ৩৪-৩৭ নং আয়াতসমুহে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ইরশাদ করেন:
یَومَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ-وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ-وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ-لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ.

“সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মাতা, তার পিতা, এবং তার স্ত্রী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন তারা প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকবে।”

বিশ্বনবী ﷺ ইরশাদ করেন:
يَعْرَقُ النَّاسُ يَوْمَ القِيَامَةِ حَتَّى يَذْهَبَ عَرَقُهُمْ فِي الأَرْضِ سَبْعِينَ ذِرَاعًا، وَيُلْجِمُهُمْ حَتَّى يَبْلُغَ آذَانَهُمْ
অর্থাৎ, কিয়ামাতের দিন মানুষের ঘাম ঝরবে। এমনকি তাদের ঘাম যমীনে সত্তর হাত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে এবং তাদের মুখ পর্যন্ত ঘামে ডুবে যাবে; এমনকি কান পর্যন্ত। (সহীহ বুখারী: ৬৫৩২)

আরেকটি হাদীসে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
تُدْنَى الشَّمْسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنَ الْخَلْقِ، حَتَّى تَكُونَ مِنْهُمْ كَمِقْدَارِ مِيلٍ

অর্থাৎ, কিয়ামত দিবসে সূর্য মানুষের খুব নিকটবর্তী হবে। এমনকি এর দুরত্ব এক মাইল পরিমাণ হবে। (সহীহ মুসলিম: ২৮৬৪)

মুসল্লিয়ানে কিরাম! কিয়ামতের ময়দানে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি যখন তৈরি হবে, যখন মানুষ তার আমল অনুযায়ী সূর্যের প্রখরতার কারণে ঘামের মধ্যে সাঁতার কাটার মতো অবস্থা হবে, তখন এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য রাসুলে আকরাম সা. আমাদেরকে শর্তসাপেক্ষে কিছু সুসংবাদ দান করেছেন। যা খুতবার শুরুতেই আমি ঐ হাদিসের কিয়দাংশ পাঠ করেছি।

রাসুলুল্লাহ ﷺ হাশরের ময়দানের কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সাতটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলো অনুসরণ করলে একজন মু’মিন বান্দা সেদিন এই বিপদ থেকে বাঁচতে পারে। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা রাযি. ‘র বরাতে আমরা জানতে পারি যে, প্রিয় নবী ﷺ ইরশাদ করেন:
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ في ظِلِّهِ يَوْمَ لا ظِلَّ إلَّا ظِلُّهُ: إِمامٌ عادِلٌ، وشابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللَّه تَعالى، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ في المَسَاجِدِ، وَرَجُلانِ تَحَابَّا في اللَّه: اجتَمَعا عَلَيهِ، وتَفَرَّقَا عَلَيهِ، وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ، وَجَمَالٍ فَقَالَ: إِنِّي أَخافُ اللَّه، ورَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فأَخْفَاها، حتَّى لا تَعْلَمَ شِمالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينهُ، ورَجُلٌ ذَكَرَ اللَّه خالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ متفقٌ عَلَيْهِ.
“কিয়ামত দিবসে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ‘আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন, যেদিন তার ছায়া ব্যতীত ভিন্ন কোনো ছায়া থাকবে না- (১) ন্যায়পরায়ন বাদশাহ৷ (২) এমন যুবক যে তার যৌবন ব্যয় করেছে আল্লাহর ইবাদতে৷ (৩) ওই ব্যক্তি যার অন্তর সর্বদা সংশি­ষ্ট থাকে মসজিদের সাথে৷ (৪) এমন দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছে এবং বিচ্ছিন্ন হয়েছে তারই জন্য৷ (৫) এমন ব্যক্তি যাকে কোনো সুন্দরী নেতৃস্থানীয় এক রমণী আহ্বান করল অশ্লীল কর্মের প্রতি, কিন্তু প্রত্যাখ্যান করে সে বলল, আমি আল্লাহকে ভয় করি৷ (৬) এমন ব্যক্তি, যে এরূপ গোপনে দান করে যে, তার বাম হাত ডান হাতের দান সম্পর্কে অবগত হয় না। (৭)
আর এমন ব্যক্তি, নির্জনে যে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার দু-চোখ বেয়ে বয়ে যায় অশ্রুধারা”।
বুখারী ও মুসলিম।

মুসল্লিয়ানে কিরাম! আলোচ্য হাদিসে আমরা প্রথম যে শ্রেণির আলোচনা দেখতে পাই তারা হচ্ছেন ন্যায়পরায়ণ শাসক। অর্থাৎ যারা ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার মানদণ্ডে উন্নীত হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। যারা নিজেদেরকে দেশের মালিক মনে না করে কেবলই একজন সেবক হিসেবে দেখে। দেশ, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে নিজের উপর শুধুমাত্র একটি আমানত হিসেবেই বিবেচনা করে। ন্যায়পরায়ণ শাসকদের প্রতি দিকনির্দেশনা প্রদান করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ইরশাদ করেন:
فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ

“তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দিবে এবং ইনসাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে পছন্দ করেন।” (সুরা হুজুরাত-০৯)

সুরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে রাব্বে কারীম ইরশাদ করেন,
إِنَّ اللّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা এবং সদাচরণের নির্দেশ দিচ্ছেন”।

শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া মহান আল্লাহর তরফ থেকে একটি বিশাল নিয়ামত। বিচক্ষণ এবং দূরদর্শী সেই শাসক হবেন যিনি এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে সচেষ্ট হবেন। একজন ন্যায়পরায়ণ, ইমানদার শাসকের এই বোধটুকু যদি না থাকে তাহলে তিনি স্বেচ্ছাচারী এবং স্বৈরাচারী হতে বাধ্য। শাসকদের দায়িত্ব এবং কর্তব্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন:
الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ.
“আমি তাদেরকে পৃথিবীতে (রাজ) ক্ষমতা দান করলে তারা সালাতে কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং সৎ কাজের আদেশ দেয় ও অসৎকার্য হতে নিষেধ করে। আর সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর আয়ত্তে”। সুরা হাজ্ব-৪১।

আলোচ্য আয়াতে ইসলামী রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। যার বাস্তবায়ন খেলাফতে রাশেদা ও প্রথম শতাব্দীর ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তাঁরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঐ সমস্ত উদ্দেশ্য সাধন করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আর যার কারণে তাঁদের রাজ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা বিস্তার লাভ করেছিল৷ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যও ছিল এবং মুসলিমরা মাথা উঁচু করে জীবন যাপন করতে পেরেছিলেন।

মুসল্লিয়ানে কিরাম! রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَ كُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَ اَلْأَمِيرُ اَلَّذِي عَلَى اَلنَّاسِ رَاعٍ وَ هُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ.
“তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন তত্বাবধায়ক, এবং অধীনস্থদের ব্যাপারে তোমরা (কিয়ামত দিবসে) জিজ্ঞাসিত হবে। যে মানুষের নেতা বা শাসক হবে, সে তার শাসনাধীনে থাকা ব্যক্তিদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।”

অতএব, একজন বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান শাসক তিনিই হবেন যিনি কিয়ামত দিবসের ভয়াল অবস্থা বিবেচনা করে সমাজ, মহল্লা, গোষ্ঠী এবং সর্বোপরিভাবে দেশ ও দেশের মানুষের সাথে ইনসাফপূর্ণ আচরণ করবেন এবং হাশরের ময়দানের কঠিনতম অবস্থায় আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় পাওয়ার জন্য সচেষ্ট থাকবেন।

২. মুসল্লিয়ানে কিরাম!
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পবিত্র মুখ-নিঃসৃত বাণী দ্বারা প্রাপ্ত হাশরের ময়দানের কঠিনতম অবস্থায় আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয়প্রাপ্ত মুমিনদের তালিকায় দ্বিতীয় পর্যায়ে আছেন এমন যুবক (অথবা যুবতী) যিনি তার যৌবনকাল ব্যয় করেছেন কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদাতের মাধ্যমেই।
হাদিসের এই অংশে আল্লাহর রাসুল ﷺ ইরশাদ করেন:
شابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللَّه تَعالى.
“এমন যুবক (কিংবা যুবতী) যে তার যৌবন ব্যয় করেছে আল্লাহর ইবাদতে”।

মুসল্লিয়ানে কিরাম! ইসলামে যৌবনকালের ইবাদত-বন্দেগির গুরুত্ব সীমাহীন। এ সময়ের ইবাদত যে আল্লাহ তাআলার কাছে খুবই প্রিয়, তা ওঠে এসেছে প্রিয়নবী ﷺ এর বর্ণনায়:
“একজন বৃদ্ধের ইবাদাতের চেয়ে আল্লাহ বেশি খুশি হন যেসব তরুণ-তরুণী যৌবন বয়সে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকে”।

প্রিয়নবী আরো বলেন, ‘কেয়ামতের দিন ৫টি প্রশ্নের উত্তর দেয়া ব্যতীত মানুষকে এক কদম নড়তে দেয়া হবে না; তার মধ্যে একটি হলো- ‘সে তার যৌবনকাল কোন্ পথে ব্যয় করেছে।’

অন্য হাদিসে তিনি ৫টি অবস্থার পূর্বে ৫টি অবস্থাকে মর্যাদা দেয়ার কথা বলেছেন, তন্মধ্যে একটি হলো- ‘তোমরা বার্ধক্যের আগে যৌবনকে মর্যাদা দাও।’

প্রিয় যুবক ভাইয়েরা, এই বয়সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এ সময় মানুষ অনেক কাজ তার শক্তির জোরে করে নিতে পারে। তার শারীরিক সামর্থ্য থাকে ব্যাপক। নিরবচ্ছিন্নভাবে ইবাদাত করাটাও একটা সামর্থ্যের ব্যাপার। যা বৃদ্ধ বয়সে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। তাছাড়া, আমি বৃদ্ধ বয়সে বেঁচে থাকবো কি না সেটাও তো নিজে জানি না। কার মৃত্যু কখন এসে যায় সে তো কেউ জানে না। কুরআনে হাকীমের সুরা মুনাফিকুনের শেষ দিকে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন:
وَلَنْ يُؤَخِّرَ اللَّهُ نَفْسًا إِذَا جَاءَ أَجَلُهَا وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
“আর আল্লাহ কখনো কোন প্রাণকেই অবকাশ দেবেন না, যখন তার নির্ধারিত সময় এসে যাবে। আর তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত”। সুরা মুনাফিকুন-১১

এজন্য, আসুন প্রিয় ভাইয়েরা, সময়টাকে কাজে লাগাই। অযথা আড্ডাবাজি, গল্পগুজব কিংবা ফেসবুকিং বা ইন্টারনেটে সময় ব্যয় না করে রাব্বে কারীমের ইবাদাতে মশগুল হই। যদি নিজের জীবনের এই বসন্তকালটাকে পবিত্রতম সত্তা আল্লাহর ইবাদাতে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারি৷ তবেই আশা করা যায় কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আল্লাহ পাক তাঁর আরশের ছায়াতলে আমাদেরকে আশ্রয় দান করবেন।

৩. মুসল্লিয়ানে কিরাম! হাশরের ময়দানের বিপদসংকুল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে আল্লাহ পাক যাকে তাঁর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন তন্মধ্যে তৃতীয় প্রকার হচ্ছে, বিশ্বনবী ﷺ এর ভাষায়-
رَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ في المَسَاجِدِ
অর্থাৎ, এমন ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে সম্পর্কিত থাকে। ব্যক্তি যদি পুরুষ হন তাহলে তো তার অন্তর মসজিদের সাথেই সংযুক্ত থাকবে। যখনই সালাতের কোনো ওয়াক্ত আসবে তখনই সে মসজিদের পানে ছুটে যাবে। কোনো অবস্থাতেই জামা’য়াত ত্যাগ করার চিন্তাও সে করবে না। আর যদি মহিলা হন তাহলে উনার অন্তরটি সবসময় সবসময় ঘরের ঐ জায়গাটার প্রতি নিবদ্ধ থাকবে যেখানে তিনি প্রতিদিনকার সালাত আদায় করেন। মুয়াজ্জিনের দরাজ কণ্ঠে যখনই তিনি আযান শুনবেন তখনই তিনি তার জায়নামাযে দাঁড়িয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার দরবারে হাজিরা দিবেন। দুনিয়াবি সব ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে যে ব্যক্তি তার সালাতের জায়গাটার প্রতি নিজের অন্তরটাকে সম্পৃক্ত করে নিতে পারে কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তিই মহান আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবে।

মুসল্লিয়ানে কিরাম! কুরআনে হাকীমের বিভিন্ন আয়াত এবং বিশ্বনবী ﷺ এর অসংখ্য হাদীস দ্বারা আমরা বুঝতে পারি ঈমানের পরেই হচ্ছে সালাতের স্থান। কিয়ামতের দিন যে ব্যক্তির সালাত ঠিক থাকবে তার অন্যান্য আমলগুলোও ভালো থাকবে। কারণ সালাত ঠিকভাবে সম্পাদন করার ফলে দুনিয়ায় থাকাবস্থায় সে অন্যান্য অনৈতিক কোনো কাজে লিপ্ত হতে পারে নি। কেননা সালাত তাকে যে কোনো ধরণের বাজে কাজ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলো। কুরআনে হাকীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ
“নিশ্চয়ই সালাত (সবধরনের) অশ্লীল ও পাপকাজ থেকে (মানুষকে) বিরত রাখে।” (সুরা আনকাবুত-৪৫)

বিশ্বনবী সা. ইরশাদ করেন,
أول ما يحاسب الناس به يوم القيامة من أعمالهم الصلاة
“কিয়ামত দিবসে মানুষ তার আমলসমূহের হিসাবের ক্ষেত্রে সবার আগে সালাতের হিসাবের সম্মুখীন হবে”। (আবু দাউদ-৮৬৪, তিরমিজি-৪১৩, নাসাঈ-৪৬৫)

যেহেতু মসজিদে মানুষ সাধারণত সালাতের জন্য যায়, তাই সালাত সংক্রান্ত অল্প কিছু আলোচনা করলাম। এছাড়া শুধুমাত্র মসজিদকে ভালোবাসা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি হাদিস রয়েছে যেগুলো দ্বারা একজন মু’মিনের পূর্ণাঙ্গ ইমানের পরিচয় পাওয়া যায়।

বিশ্বনবী ﷺ ইরশাদ করেন:
“মসজিদ প্রত্যেক পরহেযগার (ধর্মভীরু) ব্যক্তির ঘর। আর যে ব্যক্তির ঘর মসজিদ সেই ব্যক্তির জন্য আল্লাহ আরাম, করুণা এবং তার সন্তুষ্টি ও জান্নাতের প্রতি পুলসিরাত অতিক্রম করে যাওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন।”

“যখন তোমাদের মধ্যে কেউ নিজ ঘরে ওযু করে মসজিদে আসে, তখন ঘরে না ফিরা পর্যন্ত সে নামাযেই থাকে। সুতরাং সে যেন হাতের আঙ্গুলগুলোর মাঝে খাঁজাখাঁজি না করে।”

“যে ব্যক্তি ওযু করে মসজিদে আসে, সে ব্যক্তি আল্লাহর মেহ্‌মান। আর মেজবানের দায়িত্ব হল, মেহ্‌মানের খাতির করা।”

তাছাড়া মসজিদ হচ্ছে মুসলমানদের একটি মিলনায়তন। যেখানে মুমিন বান্দারা প্রতিদিন পাঁঁচবার মিলিত হয়ে একে অন্যের সুখ-দুঃখের সারথি হয়।

মুসল্লিয়ানে কিরাম! যদি কিয়ামত দিবসের বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হয় তবে অবশ্যই আমাদের সবাইকে মসজিদমুখী হতে হবে। আমাদের অনেক বাবা-চাচারা আছেন যারা নিজেরা সালাতে মনোযোগী, মসজিদের সাথে দিল সম্পৃক্ত। কিন্তু নিজের সন্তানদের ব্যাপারে উদাসীন। ছেলে কিংবা ভাতিজা মসজিদে আসছে কি না সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ বেখবর থাকি অনেকেই। এমন হলে চলবে না। পরিবারের সবাইকেই সালাতের ব্যাপারে উদ্ভুদ্ধ করতে হবে তবেই আমাদের পরিবারগুলো হয়ে উঠবে একেকটি ‘জান্নাতী পরিবার’।

৪. মুসল্লিয়ানে কিরাম! আমরা আলোচনা করছিলাম সেই সৌভাগ্যবান সাত শ্রেণির মু’মিনের কথা, যারা কিয়ামতের ময়দানে কঠিনতম পরিস্থিতিতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার সন্তুষ্টির ভিত্তিতে তাঁর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবে। তন্মধ্যে ৪র্থ প্রকার হচ্ছে মহানবী ﷺ এর ভাষায়-
رَجُلانِ تَحَابَّا في اللَّه: اجتَمَعا عَلَيهِ، وتَفَرَّقَا عَلَيهِ

“এমন দু’জন ব্যক্তি যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পরকে ভালোবাসেন, একত্রিত হন, আবার তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করেন”। অর্থাৎ দুনিয়ার কোনো স্বার্থে তারা সম্পর্ক সৃষ্টি করে না এবং বিচ্ছিন্নও হয় না।
হাদিসের আলোচ্য অংশ দ্বারা কাউকে ভালোবাসা এবং কারো সাথে বিচ্ছেদের ব্যাপারে আমরা ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে জানতে পারি। এ সম্পর্কে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গী হচ্ছে, আমাদের পারস্পরিক বন্ধুত্ব হবে শুধুমাত্র আল্লাহকে পাওয়ার জন্য। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয় এমন মানুষের সাথে আমি বন্ধুত্ব স্থাপন করব। কারণ, একজন সাথির উপর অন্য সাথী বা বন্ধুর বিশাল প্রভাব থাকে। সাথী ভালো হলে আলহামদুলিল্লাহ। আর সাথী খারাপ হলে তো ব্যক্তির দুনিয়া-আখেরাত সবই বরবাদ হয়ে যাবে। সাথী নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কয়েকটি হাদিস প্রণিধানযোগ্য।
বিশ্বনবী ﷺ ইরশাদ করেন:

مَن أحبَّ للَّهِ وأبغضَ للَّهِ ، وأعطى للَّهِ ومنعَ للَّهِ فقدِ استَكْملَ الإيمانَ

“যে আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসলো, আল্লাহর জন্য কারো সাথে বিদ্বেষ পোষণ করলো, আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে কিছু দান করলো এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে (খারাপ কাজ থেকে) বিরত রাখলো, তাহলে সে যেনো তার ঈমানকে পরিপূর্ণ করে নিলো”। (আবু দাউদ: ৪৬৮১ তাবারানী: ৭৬১৩)

সুবহানাল্লাহ। কত বিশাল অর্থপূর্ণ হাদীস!

তাছাড়া একটি হাদীসে ক্বুদসীতে রাসুল ﷺ ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلاَلِي؟ الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي، يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلِّي.

“কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা ডাক দিয়ে বলবেন, আমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পরস্পর ভালোবাসা স্থাপনকারীরা কোথায়? আজ, যে দিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া থাকবে না- আমি তাদের ছায়া দেব। (সহীহ মুসলিম-৪৬৫৫)

হাজিরানে মাজলিস! আল্লাহর জন্য ভালোবাসা-এর অর্থ হচ্ছে, এক মুসলিম ভাই অপর মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণ ও আল্লাহর আনুগত্য কামনা করা। সম্পদের মোহ, বংশ বা স্থান ইত্যাদির কোন সংশ্লিষ্টতা একে অপরের সম্পর্কের ও ভালোবাসার মানদণ্ড হবে না। যদি আমরা ঠিক এভাবেই (যেভাবে রাসুল ﷺ বলেছেন) একে অপরকে ভালোবাসতে পারি তবেই আশা করা যায় কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দান করবেন।

৫. মুসল্লিয়ানে কিরাম! এবার আসি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে। যে কয়টি ভালো আমল করলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা হাশরের ময়দানের কঠিনতম অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়ে তাঁর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন তন্মধ্যে ৫ম প্রকার হচ্ছে, রাসুল ﷺ এর ভাষায়,
ورجلٌ دعته امرأةٌ ذات منصبٍ وجمالٍ، فقال: إني أخاف الله.
“এমন (সচ্চরিত্রবান) ব্যক্তি যাকে কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের রূপসী রমণী (কামনা-লালসা পূরণের উদ্দেশ্যে) আহবান করে। কিন্তু (এরূপ সুযোগ পেয়েও) তিনি বলেন, আমি আল্লাহকে ভয় করি”।
ঠিক একইভাবে যদি পুরুষ অপর কোনো মহিলাকে অসৎ উদ্দেশ্যে আহবান করে আর মহিলাটি সচ্চরিত্রা হয় এবং বলে, না, না, আমি আল্লাহকে ভয় করি৷ তাহলে এই ধরণের ব্যক্তিও কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ জাল্লা শানুহুর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবে।

মুসল্লিয়ানে কিরাম! এখানে যে বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে সেটি হচ্ছে যিনা বা ব্যভিচার, যা আমাদের জন্য একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। একটি সমাজ বা জাতিগোষ্ঠীর নৈতিকতার মানদণ্ড হচ্ছে সে জাতি কিংবা সমাজ কতটুকু নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী তার উপর। যিনা বা ব্যভিচার ব্যক্তিকে চরমভাবে স্খলিত করে। ইসলামে যিনা করা তো দূরের কথা, ব্যভিচারের ধারে-কাছে যাওয়াটাকেও হারাম করে দিয়েছে। অর্থাৎ যেসব বিষয় ব্যভিচারকে উদ্বুদ্ধ করে সেসব বিষয়ও ইসলাম সমর্থন করে না। কুরআনে কারীমে সুরা বনী ইসরাইলে ইরশাদ হচ্ছে,
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“তোমরা যিনা বা ব্যভিচারের ধারে-কাছেও যেয়ো না, নিশ্চয়ই তা অশ্লীল ও মন্দ পথ”।
(সুরা বনী ইসরাইল-৩১)
ব্যভিচারির পরিণাম দুনিয়াতেও খারাপ, আখেরাতেও খারাপ। দুনিয়ায় তো তার জন্য রয়েছে শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি। আর পরকালে তো রয়েছে জাহান্নামের অবধারিত শাস্তি। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
“যিনাকারী যিনা করার সময় তার ঈমান থাকেনা।” (বুখারী)

“যখন কেউ যিনায় লিপ্ত হয়, তার অন্তর থেকে ঈমান উঠে যায়। এবং যখন সে বিরত হয়, তার ঈমান আবার ফেরত আসে।” (আবু-দাউদ)

“যে কেউ মদ খায় অথবা যিনায় লিপ্ত হয়, আল্লাহ তার থেকে ঈমান এইভাবে উঠিয়ে নেন, যেভাবে মানুষ শরীর থেকে জামা খুলে ফেলে।” (হাকিম)

“তিন ধরনের ব্যক্তির সাথে মহামহিম আল্লাহপাক কথা বলবেন না, তাদেরকে পাপ থেকে পবিত্র করবেন না এবং তাঁদের দিকে তাকাবেনও না। তারা হলো: বৃদ্ধ ব্যাভিচারী, মিথ্যাবাদি রাজা বা শাসক এবং অহঙ্কারী দরিদ্র ব্যক্তি।” (মুসলিম)

মুসল্লিয়ানে কিরাম! ব্যভিচার আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গিয়েছে। যার কারণেই আমাদের সমাজটি আজ একটি অভিশপ্ত সমাজ হিসেবে চিত্রিত হয়ে আছে। নৈতিকতাসম্পন্ন একটি উন্নত সমাজ বিনির্মাণে যিনা বা ব্যভিচার বাদ দেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। যদি আমরা নিজেরা নিজেকে ব্যভিচার থেকে রক্ষা করতে পারি তাহলে কিয়ামতের দিন শুধু আরশের ছায়া নয় বরং জান্নাতেরও সুসংবাদ আমরা পেতে পারি।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন,
مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بيْنَ رِجْلَيْهِ أضْمنْ لهُ الجَنَّة.

“যে ব্যক্তি আমাকে তার দু চোয়ালের মধ্যবর্তী (যবান) এবং দু রানের মধ্যবর্তী (লজ্জাস্থান) স্থানের যিম্মাদার হতে পারবে, কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য জান্নাতের যিম্মাদার হয়ে যাবো।
(বুখারী ও মুসলিম)
সুবহানাল্লাহ!

সম্মানিত যুবক ভাইয়েরা! ইসলামের এই শাশ্বত বিধানটাকে মেনে চলার চেষ্টা করি। সবধরনের অশ্লীলতা, বেহায়াপনা এবং অনৈতিকতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করি। তবেই আল্লাহ পাকের নিকট আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করার আশা করতে পারি।

৬. মুসল্লিয়ানে কিরাম! আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয়প্রাপ্ত সৌভাগ্যবান মুমিনদের তালিকায় ছয় নম্বরে যার কথা এসেছে তিনি হলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ভাষায়-
رَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فأَخْفَاها، حتَّى لا تَعْلَمَ شِمالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينهُ.
“যে (এমন) গোপনে সাদকা বা দান করে। যা ডান হাতে দান করলে তার বাম হাত খবর রাখে না”।

মুসল্লিয়ানে কিরাম! সাদাকাহ হচ্ছে একটি বিশেষ গুণ। সবার মন সাদাকাহর জন্য উন্মুক্ত থাকে না। অনেকেরই মনের সংকীর্ণতার কারণে সাদাকাহর মতো একটি বিশেষ আমল থেকে সে বঞ্চিত হয়। ক্ষেত্রবিশেষে তো সাদাকাহ করা আবশ্যক । যেমন যাকাত, সাদাকাতুল ফিতর ইত্যাদি। অন্যান্য ক্ষেত্রসমূহে হয়তো সাদাকাহ আবশ্যক নয়, কিন্তু এর গুরুত্ব ও ফজিলত খুব বেশি। সাদাকাহর মাধ্যমে ব্যক্তির সম্পদ কমে না বরং বাড়ে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ইরশাদ করেন:
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ
“আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং সাদাকাহকে বর্ধিত করেন”। (সুরা বাকারা: ২৭৬)

আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী সাদাকাহ করবো। তবে যাই করি না কেনো, এ ক্ষেত্রে কোনো ধরণের লোক দেখানো বা লৌকিকতার প্রকাশ থাকবে না। যদি মানুষকে দেখানো উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবে আমার সংশ্লিষ্ট আমলটিই বাতিল হয়ে যাবে।
রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদাতের মধ্যে শিরকের আশংকা থেকে যায় বলেই শরীয়াত এটাকে নিষিদ্ধ করেছে। তবে লোক দেখানো ছাড়া শুধুমাত্র মানুষকে ভালো কাজের প্রতি উৎসাহ দানের লক্ষ্যে সাদাকাহ কিংবা অন্যান্য ভালো প্রকাশ্য করলে কোনো গুনাহ হবে না। বরং অন্যকে পথ দেখানোর ফলে আপনি আরো সওয়াবের ভাগিদার হবেন।

সম্মানিত মুসল্লিয়ান! নিজের আমলকে আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় এবং মাক্ববুল করে তুলতে আসুন সবধরনের রিয়া বা স্বেচ্ছাপ্রদর্শন থেকে নিজেকে মুক্ত রাখি এবং কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় পাবার নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলি।

৭. মুসল্লিয়ানে কিরাম! আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয়প্রাপ্ত সৌভাগ্যবান মুমিনদের তালিকায় এবার যার নাম আসবে তিনি এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। বস্তুত উপরে যে ছয় শ্রেণির আলোচনা হয়েছে তার সারনির্যাস হাদিসের এই অংশটুকুতে বিদ্যমান। রাসুলুল্লাহ ﷺ হাদিসের শেষ সপ্তম শ্রেণির উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন:
رَجُلٌ ذَكَرَ اللَّه خالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ.
“এমন ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহপাকের জিকিরে ও ইবাদতে মশগুল থাকে এবং আল্লাহর ভয়ে যার নয়ন অশ্রুসিক্ত হয়”।
ইবাদতের কোয়ালিটি বা মান নির্ণীত হবে আপনি আপনার মনটাকে কতটুকু বিগলিত করে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করেছেন তার উপর। আপনার মন যতটুকু বিনয়াবনত হবে আল্লাহর ভয়ে, ঠিক ততটুকু অশ্রু ঝরবে আপনার চোখ থেকে। আমরা ঠিকই প্রতিদিন সালাত আদায় করি, যিকর-আযকার করি। কিন্তু আমাদের মনটা আল্লাহর ভয়ে বিগলিত হয় না। শুধুমাত্র দায়মুক্তির জন্যই আমরা ইবাদাত বন্দেগী করি। এজন্যেই আমাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে না। অথচ এই অশ্রু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার নিকট অতি প্রিয় একটি বস্তু। রাসুল ﷺ এর বিভিন্ন হাদিস দ্বারা আমরা এর প্রমাণ খুঁজে পাই। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ ইরশাদ করেন:
لاَ يَلِجُ النَّارَ رَجُلٌ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِي الضَّرْعِ.
“আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকারীর জাহান্নামে যাওয়া এরূপ অসম্ভব যেরূপ দোহনকৃত দুধ পুনরায় পালানে ফিরে যাওয়া অসম্ভব”। (তিরমিযী: ১৬৩৩, নাসায়ী: ৩১০৮)

আরেকটি হাদীসে এসেছে, ইবনু আববাস রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি-
عَيْنَانِ لاَ تَمَسُّهُمَا النَّارُ: عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللهِ، وَعَيْنٌ بَاتَتْ تَحْرُسُ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ،
“জাহান্নামের আগুন দু’টি চোখকে স্পর্শ করবে না। এক- আল্লাহর ভয়ে যে চোখ ক্রন্দন করে এবং দুই- আল্লাহর রাস্তায় যে চোখ পাহারা দিয়ে বিনিদ্র রাত অতিবাহিত করে”। (তিরমিযী: ১৬৩৯)

মুসল্লিয়ানে কিরাম! আসলে হাশরের ময়দানটি অত্যন্ত ভীতিপ্রদ একটি জায়গা। যেখানে মানুষ নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। দুনিয়ায় যদি আমরা ভালো কাজ করে যেতে তাহলে সেগুলোকে কাল কিয়ামতের ফিক্সড ডিপোজিট হিসেবে আমরা দেখতে পাবো। এজন্য একজন বুদ্ধিমান মুমিনের উচিৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার বাণী অনুসরণ করে আগামীকাল অর্থাৎ কিয়ামতের ময়দানের ভয়াবহতা থেকে নিজেকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করা।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ

“হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আর প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা যে, সে আগামীকালের জন্য কী প্রেরণ করেছে; তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।” (সুরা হাশর-১৮)

আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে উপরোক্ত সাতটি বিষয়ের উপর আমল করার তাওফিক দান করুন, এবং কাল কিয়ামতের ময়দানে তাঁর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দান করুন। আমীন।

লেখক : হাফিয মাওলানা আসআদ বিন সিরাজ
ইমাম ও খতিব : বায়তুন নাজাত জামে মসজিদ, ই-ব্লক উপশহর, সিলেট৷

 

Share.

লেখক পরিচিতি

Leave A Reply

Top