জুমু’আর বয়ান। বিষয় : সবর তথা ধৈর্যধারণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

0

তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯.
২৭ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী। জুমু’আবার৷

الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم. بسْمِ الله الرَّحْمَن الرَّحيم: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ.
ﺑَﺎﺭَﻙَ ﺍﻟﻠﻪُ ﻟَنا ﻭَﻟَﻜُﻢْ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻘُﺮْﺁﻥِ ﺍﻟْﻌَﻈِﻴْﻢِ . ﻭَﻧَﻔَﻌنا ﻭَﺍِﻳِّﺎﻛُﻢْ ﺑِﻤَﺎ ﻓِﻴْﻪِ ﻣِﻦَ ﺍﻵﻳَﺎﺕِ ﻭَﺍﻟﺬِّﻛْﺮِ ﺍﻟْﺤَﻜِﻴْﻢِ .

মুহতারাম হাযেরীন! আজ মুহাররম মাসের চতুর্থ জুমু’আ-বার৷ আজকের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, সবর বা ধৈর্যধারণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য৷

সবর বা ধৈর্যের অর্থ হচ্ছে, নিয়ন্ত্রণ করা, কন্ট্রোল করা৷ মুজাহিদ রাহ, বলেন: সবর হচ্ছে, যার সাথে হা-হুতাশ বা অস্থিরতা নেই৷ (ইবনে কাসীর)

আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে মানুষকে বিভিন্ন হালত ও অবস্থার মুখোমুখি করেন৷ কোনো কোনো অবস্থা ধৈর্যের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হয়৷ ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়৷ মূলত ধৈর্য হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিত্বের শোভা৷ মুমিনের শক্তি ও পাথেয়৷ ধৈর্য শয়তানের উপর বিজয়ী হওয়ার বড় হাতিয়ার৷ ধৈর্য এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার দুনিয়াবী কাজেও প্রয়োজন, শরয়ী বিষয়েও প্রয়োজন৷ তাই তো হাদিসে এসেছে-
الصبر ضياءٌ
ধৈর্য হচ্ছে আলো৷ (সহিহ মুসলিম)
মানে ধৈর্য মুমিনের দুনিয়া এবং আখিরাত আলোকিত করে দেয়৷

আল্লাহর হুকুম পালনের ডাক এসেছে৷ কিন্তু মন চাচ্ছে না৷ এখানেও ধৈর্যধারণ করে হুকুম পালন করতে হবে৷ গোনাহের হাতছানি আছে৷ মন চাচ্ছে গোনাহ করে ফেলতে৷ কিন্তু এটা গোনাহের কাজ, আল্লাহর নিষেধ আছে৷ পরকালীন শাস্তির ভয় আছে৷ এখানেও ধৈর্যধারণ করে গোনাহ থেকে বাঁচতে হবে৷

সম্মানিত মুসল্লিয়ান!
ধৈর্য এমন এক পাথেয়, অসুস্থ ব্যক্তির অসুস্থতাজনিত কষ্ট সহ্য করতে যার প্রয়োজন৷ বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির বিপদ কাটিয়ে উঠতেও প্রয়োজন৷ স্বামী-স্ত্রীর সংসার পরিচালনায় যেমন ধৈর্যের প্রয়োজন, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ বিনির্মাণেও তার প্রয়োজন৷ বাবার সন্তানের বেলায় ধৈর্যের প্রয়োজন, শিক্ষক ছাত্রের বেলায়ও ধৈর্য অপরিহার্য৷ অধিনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেলায় আরো বেশি ধৈর্যের প্রয়োজন৷ হাটে, মাঠে, ঘাটে সর্বত্র কেবল কেবল ধৈর্য আর ধৈর্য৷ মোটকথা জীবনের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে ও পদক্ষেপে ধৈর্যের বিকল্প নেই৷

আল্লাহ তাআলা সবচে বেশি পরীক্ষা নিয়েছেন, কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করেছেন নবী-রাসূলগণকে৷ হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে আপন পুত্র ও উম্মতের মাধ্যমে৷ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে নমরুদ কর্তৃক অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ, স্ত্রী-সন্তানকে নির্জন মরু-প্রান্তরে রেখে আসা, পরবর্তীতে আপন সন্তানকে কুরবানি করার হুকুমের মাধ্যমে৷ হযরত লুত আলাইহিস সালামকে পাপিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মাধ্যমে৷ হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামকে পুত্র ইউসুফ আলাইহিস সালামের বিয়োগের মাধ্যমে৷ হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালামকে কঠিন রোগের মাধ্যমে৷ হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে মাছের খাদ্য হওয়ার মাধ্যমে৷ হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে আপন সম্প্রদায় ও ফেরাউনের মাধ্যমে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে৷ তাই তো হাদিসে এসেছে-
عَنْ سَعْد بن أبي وقاص رضي الله عنه قَالَ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ, أَيُّ النَّاسِ أَشَدُّ بَلاءً؟ قَالَ: الأَنْبِيَاءُ, ثُمَّ الأَمْثَلُ فَالأَمْثَلُ, فَيُبْتَلَى الرَّجُلُ عَلَى حَسَبِ دِينِهِ
সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস রাযি. বলেন: আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! মানুষের মাঝে কার বিপদের পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন হয়? তিনি বললেন,  নবিদের৷ তারপর যারা নেককার তাদের, এরপর যারা নেককার তাদের বিপদের পরীক্ষা। মানুষকে তার ধর্মানুরাগের অনুপাত অনুসারে পরীক্ষা নেয়া হয়৷ (তিরমিযি: ২৩৯৮)

যেহেতু নবীগণের পরীক্ষা নেয়া হয়েছে সবচে বেশি এবং পরীক্ষাও হয়েছে কঠিন, তাই আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে তাঁদের ধৈর্যের আলোচনা করেছেন, বিবরণ দিয়েছেন জায়গায় জায়গায়৷ আল্লাহ তাআলা রাসুল ﷺকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ
অর্থ: অতএব, আপনি সবর করুন, যেমন উচ্চ সাহসি পয়গম্বরগণ সবর করেছেন৷ (সুরা আহকাফ: ৩৫)

ধৈর্যের সেই মহান গুণের কারণেই তাঁরা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ‘উলুল আযম তথা উচ্চ সাহসি’ খেতাবে ভূষিত হয়েছেন৷

পেয়ারে হাযেরীন! আমরা এখন সবরের প্রকারভেদের আলোচনা করব৷

সবর বা ধৈর্য তিন প্রকার:
১. আল্লাহর হুকুম-আহকাম, বিধিবিধান পালনে ধৈর্যধারণ করা৷
২. হারাম ও আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করা৷
৩. আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত বিপদ-মুসিবত ও বিভিন্ন পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করা৷

আল্লাহর হুকুম-আহকাম ও বিধিবিধান পালনে ধৈর্যধারণ করা:

এটা হচ্ছে, সর্বোচ্চ স্তরের ধৈর্যধারণ৷ আল্লাহ বান্দাকে তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করার হুকুম দিয়েছেন৷ মানবজাতি সৃষ্টির মৌলিক উদ্দেশ্যই হচ্ছে, এটি৷ এখন আল্লাহর হুকুম-আহকাম মেনে চলার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা আসবে৷ বাধা আসবে৷ এই প্রতিবন্ধকতা মানুষের পক্ষ থেকেও আসতে পারে, শয়তানের পক্ষ থেকেও আসতে পারে৷ এই বাধা ডিঙিয়ে আল্লাহর পথে চলাই হচ্ছে, বড় ধৈর্য৷ আল্লাহ তাআলা সে ধৈর্যেরই হুকুম দিচ্ছেন নিচের আয়াতসমূহে৷ ইরশাদ হচ্ছে-
رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهِ
অর্থ: তিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবার পালনকর্তা। কাজেই তাঁরই ইবাদাত করুন এবং তাঁর ইবাদাতে ধৈর্যশীল থাকুন৷ (সুরা মারইয়াম: ৬৫)

আরো ইরশাদ হচ্ছে-
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا.
অর্থ: আপনি আপনার পরিবারের লোকদেরকে নামাযের আদেশ দিন এবং নিজেও এর উপর (ধৈর্যের সঙ্গে) অবিচল থাকুন। (সুরা ত্বাহা: ১৩২)

আরো ইরশাদ হচ্ছে-
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ
আপনি নিজেকে ঐসব লোকদের সঙ্গ ধৈর্যের সাথে ধরে রাখুন, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহবান করে৷ (সুরা কাহফ: ২৮)

হারাম ও আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করা:

আল্লাহ যে জিনিসগুলো হারাম করেছেন, যে বিষয়গুলো নিষেধ করেছেন, সেসব থেকে নিজেকে ফিরিয়ে রাখাই হচ্ছে, ধৈর্যের দ্বিতীয় স্তর৷ বান্দা যখন আল্লাহকে ভালোবাসবে, তখন সে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে৷ কেননা যে যাকে ভালোবাসে, সে তার অনুগত হয়৷ ইমাম শাফেঈ রাহ. কতই না সুন্দর বলেছেন-
لَوْ كانَ حُبُّكَ صَادِقاً لأَطَعْتَهُ
إنَّ الْمُحِبَّ لِمَنْ يُحِبُّ مُطِيعُ.
“যদি তার প্রতি তোমার মহব্বত সত্য হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই তুমি তার আনুগত্য করবে। নিশ্চয়ই প্রেমিক প্রেমাষ্পদের অনুসারী হয়।”

বান্দা যখন আল্লাহকে ভয় করবে, তখন সে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকবে৷ কারণ বান্দা জানে গোনাহ করলে শাস্তি ভোগ করতে হবে৷ ইরশাদ হচ্ছে-
فَأَمَّا مَن طَغَى وَآثَرَ الْحَياةَ الدُّنْيَا فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ
অর্থ: অতএব যে ব্যক্তি সীমালংঘন করেছে, এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়াল-খুশি থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত। (সুরা নাযি’আত: ৩৭-৪১)

বান্দা যখন আল্লাহর প্রতি লজ্জাবোধ করবে, তখনও সে ধৈর্যধারণের মাধ্যমে গোনাহ ত্যাগ করবে৷ এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে মনের চাহিদার বিরুদ্ধে ধৈর্যধারণ করে বান্দা গোনাহ করা থেকে বেঁচে থাকবে৷

আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত বিপদ-মুসিবত ও বিভিন্ন পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করা:

ধৈর্যের তৃতীয় বা সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে, বিপদ-মুসিবতে ধৈর্যধারণ করা৷ যখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কোনো মুসিবত আপতিত হয়, বা কঠিন পরীক্ষা আসে, তখন হা-হুতাশ, অস্থির বা অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থেকে ধৈর্যধারণ করা৷

ইরশাদ হচ্ছে-
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

অর্থ: আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব ভয়-ভীতি ও ক্ষুধা দ্বারা এবং জানমাল ও ফসলহানি দ্বারা। যেসব লোক সবরের পরিচয় দেয় তাদেরকে সুসংবাদ শোনাও, যারা তাদের কোন মসিবত দেখা দিলে বলে ওঠে, আমরা সকলে আল্লাহরই এবং আমাদেরকে তাঁরই কাছে ফিরে যেতে হবে। (সুরা বাকারা: ১৫৫-১৫৬)

আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বলেছেন بلاء “বালা”। বালা মানে পরীক্ষা। বলা হচ্ছে, শত্রু কোন ক্ষতি করবে এই ভয়, অভাব-অনটন ও ক্ষুধার কষ্ট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলহানি, ব্যবসায়ে ভরাডুবি, চাকরিচ্যুতি, অনাকাঙ্ক্ষিত অর্থক্ষয়, রোগ-ব্যাধি ও প্রিয়জনের বিয়োগ প্রভৃতির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষা করা হয় সবরের। দেখা হয় সে কি বিপদে দিশাহারা হয়ে আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে অভিযোগ করে? মানুষের কাছে নিজ ভাগ্য-বিপর্যয়ের কথা গেয়ে বেড়ায়? বেফাঁস কথা বলে নিজ ঈমান-আমলের সর্বনাশ ঘটায়? নাকি এক আল্লাহর অভিমুখি হয়ে তাঁরই কাছে ফরিয়াদ জানায়, তাঁর ফয়সালাকে মেনে নিয়ে নিজ দুর্বলতা ও অসহায়ত্বের কথা তাঁরই সমীপে নিবেদন করে৷ কেবল তাঁরই কাছে সাহায্য চায় এবং কথায় ও কাজে এ বিশ্বাসের পরিচয় দেয় যে, বিপদাপদ কেবল তিনিই দিয়ে থাকেন এবং তা দূরও কেবল তিনিই করতে পারেন? এর সারকথা হলো আল্লাহতে আত্মসমর্পিত হওয়া। এটাই সবরের সারবস্তু। বিপদাপদে যে ব্যক্তি সবর অবলম্বন করবে সে-ই পরীক্ষায় কৃতকার্য হবে। তার কাছে এ কৃতকার্যতাই কাম্য।

আল্লাহ তাআলা বিপদ দেন বান্দাকে ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং তার সবরের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য, আত্মার মলিনতা দূর করে তাকে বন্দেগির উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর জন্য। তাই তো বান্দা যখন ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আল্লাহর শিখিয়ে দেয়া কালেমা পাঠ করে:
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

আল্লাহ বান্দার উপর সন্তুষ্ট হয়ে তাকে পুরস্কৃত করার ঘোষণা দেন৷
বলেন:
أُوْلَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُوْلَئِكَ هُمْ الْمُهْتَدُونَ
অর্থ: তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত৷ (সুরা বাকারা:
১৫৭)

সবরের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য ও সান্নিধ্য অর্জন:
ইরশাদ হচ্ছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। (সুরা বাকারা: ১৫৩)
আল্লাহর সাহায্য আর সান্নিধ্য অর্জন হলে তো বান্দার আর কী চাই৷ বান্দার জীবনের সব আয়োজন তো আল্লাহকে পাওয়ার জন্যই৷ আর সেটা ধৈর্যের মাধ্যমে অর্জিত হচ্ছে৷ সুতরাং ধৈর্য সাধারণ কোনো গুণ নয়, বরং মুমিন জীবনের সফলতা আর কামিয়াবির প্রধান হাতিয়ার৷

ধৈর্যের মাধ্যমে নেতৃত্ব লাভ:

আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের আলোচনা করে বলেন:
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآَيَاتِنَا يُوقِنُونَ.
তারা সবর করত বিধায় আমি তাদের মধ্য থেকে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার আদেশে পথ প্রদর্শন করত৷ তারা আমার আয়াতসমূহে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলো৷ (সুরা সাজদাহ: ২৪)

ইবনে কাসীর রাহ. কিছু উলামার মন্তব্য নকল করেন যে, ধৈর্য ও দৃঢ় বিশ্বাসের মাধ্যমেই দ্বীনের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের মর্যাদা লাভ করা যায়৷

ধৈর্যের কারণে বিনা হিসাব জান্নাত ও অগণিত পুরস্কার লাভ:

আবু নুআইম বর্ণনা করেন যে, হাশরের ময়দানে ঘোষণা করা হবে, ধৈর্যধারণকারীরা কোথায়? এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সেসব লোক উঠে দাঁড়াবে, যারা তিন প্রকারেই সবর করে জীবন অতিবাহিত করে গেছেন৷ এসব লোককে প্রথমেই বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়া হবে৷ ইবনে কাসীর এ বর্ণনা উদ্ধৃত করে মন্তব্য করেছেন যে, কুরআনের আয়াত-
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَاب
অর্থাৎ সবরকারি বান্দাগণকে তাদের পুরস্কার বিনা হিসাবে প্রদান করা হবে৷
এ আয়াতে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে৷

ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্তি:

ইরশাদ হচ্ছে-
إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ
তবে যারা ধৈর্য্যধারণ করেছে এবং সৎকার্য করেছে তাদের জন্য ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান রয়েছে। (সুরা হুদ: ১১)

ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করা যায়৷
ইরশাদ হচ্ছে-
وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ
আর যারা সবর করে, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। (সুরা আলে ইমরান: ১৪৬)

ধৈর্যের মাধ্যমে জান্নাতে গৃহ নির্মাণ:
হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে-

وَعَنْ أَبي مُوسَى رضي الله عنه: أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ: إِذَا مَاتَ وَلَدُ العَبْدِ قَالَ اللهُ تَعَالَى لِمَلائِكَتِهِ قَبَضْتُمْ وَلَدَ عَبْدِي؟ فَيَقُولُونَ: نَعَمْ فَيَقُولُ: قَبَضْتُمْ ثَمَرَة فُؤَادِهِ؟ فَيَقُولُونَ: نَعَمْ فَيَقُولُ: مَاذَا قَالَ عَبْدِي؟ فَيَقُولُونَ: حَمِدَكَ وَاسْتَرْجَعَ. فَيَقُولُ اللهُ تَعَالَى: ابْنُوا لِعَبْدِي بَيْتاً فِي الجَنَّةِ وَسَمُّوهُ بَيْتَ الحَمْدِ.

অর্থ : হযরত আবু মুসা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যখন কোনো বান্দার সন্তান মারা যায়, আল্লাহ ফিরিশতাদেরকে বলেন, তোমরা আমার বান্দার সন্তানের প্রাণ নিয়েছ? তাঁরা বলেন, হ্যাঁ। তারপর আল্লাহ বলেন, তোমরা তার অন্তরের ফল কেড়ে নিয়েছ? তাঁরা বলেন, হ্যাঁ। তারপর তিনি বলেন, আমার বান্দা কী বলেছে? তাঁরা উত্তরে বলেন, সে তোমার প্রশংসা করেছে এবং ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রা-জিউন পড়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা আমার বান্দার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ নির্মাণ কর এবং তার নাম রাখ ‘প্রসংশা-গৃহ’।
(তিরমিযি: ১০২১, আহমদ: ১৯২২৬)

কারো সঙ্গে ঝগড়া বা বিতর্কের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে৷ এ ক্ষেত্রে আপনি ন্যায়ের উপরও আছেন৷ কিন্তু আপনি ধৈর্যধারণ করলেন৷ সওয়াবের আশায় বিতর্ক পরিহার করলেন৷ আপনার জন্য বিরাট পুরস্কার৷ জান্নাতে আপনার জন্য একটি বরাদ্দ হয়ে গেলো৷
রাসূলূল্লাহ ﷺ বলেন:
أَنا زَعِيمٌ ببَيتٍ في ربَضِ الجنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ المِرَاءَ وَإِنْ كَانَ مُحِقًّا
অর্থ: নিজের মতটি হক হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি বিতর্ক পরিত্যাগ করল আমি তার জন্য জান্নাতের পাদদেশে একটি বাড়ির যিম্মাদারী গ্রহণ করলাম। (আবু দাউদ: ৪৮০০, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ)

তাই আসুন! সবরের গুণে গুণান্বিত হই৷ একমাত্র আল্লাহর জন্য সওয়াবের আশায় ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত হই৷ কারণ সবর হচ্ছে, মুমিনের ঈমানি শক্তি৷

লেখক : মুফতি জিয়াউর রহমান
ইমাম ও খতিব : আম্বরখানা জামে মসজিদ, সিলেট৷

Share.

লেখক পরিচিতি

Leave A Reply

Top