জুমু’আর বয়ান। বিষয়: ‘ক্যাসিনো’ তথা মদ্যপান ও জুয়া খেলার ভয়াবহতা ও অপকারিতা

0

তারিখ: ৪ অক্টোবর, ২০১৯.
৪ সফর, ১৪৪১ হিজরি। জুমু’আবার৷

আলোচক: মুফতি জিয়াউর রহমান।

الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم. بسْمِ الله الرَّحْمَن الرَّحيم: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلاَمُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ.
ﺑَﺎﺭَﻙَ ﺍﻟﻠﻪُ ﻟَنا ﻭَﻟَﻜُﻢْ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻘُﺮْﺁﻥِ ﺍﻟْﻌَﻈِﻴْﻢِ. ﻭَﻧَﻔَﻌنا ﻭَﺍِﻳِّﺎﻛُﻢْ ﺑِﻤَﺎ ﻓِﻴْﻪِ ﻣِﻦَ ﺍﻵﻳَﺎﺕِ ﻭَﺍﻟﺬِّﻛْﺮِ ﺍﻟْﺤَﻜِﻴْﻢِ .

মুহতারাম হাযেরীন! আজ আপনাদের সামনে সারাদেশে আলোচিত টপিক ‘ক্যাসিনো’ তথা মদ্যপান ও জুয়া খেলার ভয়াবহতা ও অপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ!

ক্যাসিনো ইতালিয়ান শব্দ৷ যার অর্থ দাঁড়ায় জুয়ার ঘর, মদের বার, পানশালা বা এ জাতীয় ক্লাব৷ মানে জগতের সব বড় বড় গোনাহের আসর যেখানে জমে, সেটাকেই আধুনিক পরিভাষায় ক্যাসিনো বলে৷ এখানকার অন্যতম বড় গোনাহসমূহ হচ্ছে, মদ পান, জুয়া খেলা, প্রায় উলঙ্গ নর্তকী দ্বারা নাচের আসর প্রভৃতি৷

মদকে আরবিতে বলা হয় خمر (খামার) যার অর্থ আচ্ছন্ন করা, ঢেকে দেয়া৷ যেহেতু মদ্যপান বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, জ্ঞানের মধ্যে ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে, মানুষ হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে, তাই এটাকে خمر বা মদ বলে৷

বড় বড় পাপসমূহের উৎস হচ্ছে- মদ৷ মদ্যপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্য হচ্ছে, জীবন নষ্টকারী মরণ ছোবল৷ এই সর্বনাশা মরণ ছোবলে জাতি আজ দিশেহারা৷ প্রজন্ম আজ অকালে ধ্বংস হয়ে যচ্ছে। ভেঙ্গে পড়ছে অসংখ্য পরিবার। বিঘ্নিত হচ্ছে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বৃদ্ধি পাচ্ছে চোরাচালানসহ মানবতা বিধ্বংসী অসংখ্য অপরাধ। মাদকাসক্তির কারণে সকল জনপদেই চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস বেড়ে গিয়ে মানুষের জান-মাল ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। সমাজের অধিকাংশ অপরাধের জন্য মুখ্যভাবে দায়ী এই মাদকতা। এ জন্য রাসুল ﷺ বলেছেন:
لاَتَشْرَبِ الْخَمْرَ، فَإِنَّهُ مِفْتَاحُ كُلِّ شَرٍّ.
অর্থ: মদ পান করো না। কেননা তা সকল অপকর্মের চাবিকাঠি৷ (ইবনু মাজাহ: ৩৩৭১)

অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে:
اِجْتَنِبُوا الْخَمْرَ فَإِنَّهَا أُمُّ الْخَبَائِثِ.
অর্থ: তোমরা মদ থেকে বেঁচে থাক। কেননা তা অশ্লীল কাজের মূল। (নাসাঈ: ৫৬৬৭)

ইসলামপূর্ব যুগে আরবে মদ-জুয়ার সয়লাব ছিলো৷ সামাজিক অবক্ষয় চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গিয়েছিল৷ এক দিকে মদ্যপানের কারণে তাদের জ্ঞানবুদ্ধি লোপ পেয়েছিল, অপরদিকে জুয়ার কারণে তাদের সহায়-সম্পদও নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল৷ জুয়াতে মানুষ সম্পদ হারিয়েও ক্ষান্ত হতো না, নিজের স্ত্রী-সন্তানদের পর্যন্ত জুয়ায় বাজি ধরত৷ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মদ আর জুয়ার জয়জয়কার ছিলো৷

ইসলাম এসে হুট করেই মদ-জুয়া হারাম করে নি৷ জন্মগত ও পরিবেশগত আজীবনের অভ্যাস নির্মুলে ইসলাম তাড়াহুড়ো করে নি৷ বরং এক্ষেত্রে তিনটি পর্যায়ক্রমিক ধাপ অতিক্রম করেছে৷ মানুষের চিরাচরিত অভ্যাস পরিবর্তনের এটাই বৈজ্ঞানিক পন্থা৷ ইসলাম সেটাই প্রয়োগ করেছে৷ প্রথমেই তার ক্ষতিকর দিকগুলো মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছে৷ উপকার আর ক্ষতিকর দিক পর্যালোচনা করে ক্ষতির দিকটা যে বড়, সেটাও বলে দিয়েছে৷ মদ্যপান যে বর্জনীয়, সেটা বোঝাতে চেয়েছে৷ তবে সরাসরি বর্জন করার নির্দেশ দেয়া হয় নি৷ ইরশাদ হচ্ছে-

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ ۖ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِما

অর্থ: তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্যে উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়। (সূরা বাকারা: ২১৯)

এরপর ইসলাম বিশেষ সময় ও বিশেষ অবস্থায় মদ্যপানের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে৷ বলা হয়েছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ
অর্থ: হে ঈমাণদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাযের ধারে-কাছেও যেও না, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ৷ (সুরা মায়েদা: ৪৩)

এতে বিশেষভাবে নামাযের সময় মদ্যপানকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে৷ তবে অন্যান্য সময়ের জন্য অনুমতি রয়ে যায়৷ এরপর এসেছে সুরা মায়েদার আয়াত৷ এতে পরিষ্কার ও কঠোরভাবে মদ্যপান নিষেধ ও হারাম করে দেয়া হয়েছে৷ ইরশাদ হচ্ছে-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلاَمُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ – إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللّهِ وَعَنِ الصَّلاَةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ

অর্থ: হে মুমিনগণ! এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানি অপবিত্র কাজ বৈ কিছুই নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারো। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখনও কি নিবৃত্ত হবে না? (সুরা মায়িদা: ৯০-৯১)

ইসলাম মদ পানের ব্যাপারে শুধু মৌখিক নিষেধাজ্ঞার উপর ক্ষান্ত হয় নি৷ বরং এই আইন বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপও নিয়েছে৷ বলা হয়েছে, যার নিকট কোনো প্রকার মদ থেকে থাকে, তা তোমাদের নিকট রাখা যাবে না৷ অমুক স্থানে এনে উপস্থিত কর৷

সাহাবিগণের মধ্যে আদেশ পালনের অনুপম আগ্রহ:

যখন মদ্যপান পরিষ্কারভাবে হারাম ঘোষণা করা হলো, তখন সাহাবায়ে কেরাম নিজ নিজ ঘরে ব্যবহারের জন্য রক্ষিত মদ তৎক্ষণাৎ ফেলে দিলেন৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. বর্ণনা করেন যে, যখন রাসুলে আকরাম ﷺ এর প্রেরিত এক ব্যক্তি মদিনার অলি-গলিতে প্রচার করতে লাগলেন যে, মদ্যপান হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, তখন যার হাতে শরাবের যে পাত্র ছিলো, তা তিনি সেখানেই ফেলে দিয়েছিলেন৷ যার কাছে মদের কলস বা মটকা ছিলো, তা ঘর থেকে তৎক্ষণাৎ বের করে ভেঙ্গে ফেলেছেন৷

হযরত আনাস রাযি. তখন এক মজলিসে মদ ঢেলে দেয়ার কাজে ছিলেন৷ আবু তালহা, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, উবাই ইবনে কা’ব, সুহাইল রাযিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ নেতৃস্থানীয় সাহাবিগণ সে মজলিসে উপস্থিত ছিলেন৷ প্রচারকের ঘোষণা কানে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন, এবার সমস্ত শরাব ফেলে দাও৷ এর পেয়ালা, মটকা, হাঁড়ি ভেঙ্গে ফেলো৷ অন্য বর্ণনায় আছে, হারাম ঘোষণার সময় যার হাতে শরাবের পেয়ালা ছিলো এবং তা ঠোঁট স্পর্শ করছিল, তাও তৎক্ষণাৎ সে অবস্থাতেই দূরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে৷ সেদিন মদিনায় এ পরিমাণ শরাব নিক্ষিপ্ত হলো যে, বৃষ্টির পানির মতো শরাব প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছিল এবং দীর্ঘদিন পর্যন্ত মদিনার অলি-গলির অবস্থা এমন ছিলো যে, যখনই বৃষ্টি হতো তখন শরাবের গন্ধ ও রং মাটির উপর ফুটে উঠতো৷

যখন আদেশ যে, যার কাছে যে রকম মদ রয়েছে, তা অমুক স্থানে একত্রিত কর৷ তখন মাত্র সেসব মদই বাজারে ছিলো যা ব্যবসার জন্যে রাখা হয়েছিল৷ এ আদেশ পালনকল্পে সাহাবিগণ বিনা দ্বিধায় নির্ধারিত স্থানে সব মদ একত্রিত করেছিলেন৷ হুজুর ﷺ স্বয়ং সেখানে উপস্থিত হয়ে স্বহস্তে শরাবের অনেক পাত্র ভেঙ্গে ফেললেন এবং অবশিষ্টগুলো সাহাবিগণের দ্বারা ভাঙ্গিয়ে দিলেন৷ (মা’আরিফুল কুরআন)

মদ নিষিদ্ধের আইন বাস্তবায়নে ইসলামে সুস্পষ্ট দণ্ডবিধি রয়েছে৷ কারো মদ্যপান প্রমাণিত হলে ইসলাম ৮০ টি বেত্রাঘাতের বিধান দিয়েছে৷
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُتِيَ بِرَجُلٍ قَدْ شَرِبَ الْخَمْرَ، فَجَلَدَهُ بِجَرِيدَتَيْنِ نَحْوَ أَرْبَعِينَ، قَالَ: وَفَعَلَهُ أَبُو بَكْرٍ، فَلَمَّا كَانَ عُمَرُ اسْتَشَارَ النَّاسَ، فَقَالَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ: أَخَفَّ الْحُدُودِ ثَمَانِينَ، فَأَمَرَ بِهِ عُمَرُ
অর্থ: হযরত আনাস বিন মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ এর কাছে মাদ পান করা এক ব্যক্তি আসল। তখন তাকে খেজুর গাছের দু’টি ডাল দিয়ে চল্লিশ বেত্রাঘাত করা হয়। (এক বেতে চল্লিশ হলে, দুই বেতের দ্বারা হচ্ছে আশি) একই পদ্ধতিতে আবু বকর রাযি. ও এ অপরাধের শাস্তি দিতেন। তারপর যখন হযরত উমর রাযি. এর খেলাফতকাল এলো। তিনি লোকদের সাথে এ বিষয়ে পরামর্শ করলেন। তখন আব্দুর রহমান পরামর্শ দিলেন যে, কমপক্ষে আশি বেত্রাঘাত। (দুই ডাল একসাথে নয়, বরং আলাদা করে আশিটি) তখন হযরত উমর রাযি. আশিটি বেত্রাঘাতের হুকুম দিলেন। (সহীহ মুসলিম: ১৭০৬)

মদ পানের ক্ষতিসমূহ:

এক. ঈমানের ক্ষতি৷ যেমন, কেউ যখন মদ পান করে, তখন মদ পানরত অবস্থায় তার ভেতর থেকে ঈমানের নূর চলে যায়৷ হাদিসে এসেছে-
وَلاَ يَشْرَبُ الخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ
মদ্যপ যখন মদপান করে, মুমিন অবস্থায় করে না৷ (সহীহ বুখারী: ২৪৭৫; সহীহ মুসলিম: ৫৭)

চিন্তা করুন মদ্যপ অবস্থায় যদি সে মারা যায়, তাহলে কী অবস্থায় মারা গেলো৷

রাসুল ﷺ মদ সংশ্লিষ্ট দশ শ্রেণির লোককে লা‘নত তথা অভিসম্পাত করেছেন৷ আনাস বিন মালিক ও আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাযি. থেকে বর্ণিত, তারা বলেন:
لَعَنَ رَسُوْلُ اللهِ رسول الله صلى الله عليه وسلم فِيْ الْـخَمْرِ عَشْرَةً: عَاصِرَهَا، وَمُعْتَصِرَهَا، وَشَارِبَهَا، وَحَامِلَهَا، وَالْـمَحْمُوْلَةَ إِلَيْهِ، وَسَاقِيَهَا، وَبَائِعَهَا، وَآكِلَ ثَمَنِهَا، وَالْـمُشْتَرِيَ لَهَا، وَالْـمُشْتَرَاةَ لَهُ.
অর্থ: রাসূল ﷺ লা‘নত বা অভিসম্পাত করেন: (১) যে লোক মদের নির্যাস বের করে, (২) যে মূল কারিগর, (৩) যে পান করে, (৪) আমদানিকারক, (৫) যার জন্য আমদানি করা হয়, (৬) সরবরাহকারী, (৭) বিক্রেতা, (৮) লভ্যাংশ ভোগকারী, (৯) খরিদদার এবং (১০) যার জন্য খরিদ করা হয়। (তিরমিযি: ১২৯৫)

অন্য রেওয়ায়াতে খোদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে লা’নতপ্রাপ্ত বা অভিশপ্ত হওয়ার বিবরণ এসেছে৷

মদ পানকারীর নামায ৪০ দিন পর্যন্ত কবুল হয় না:
হাদিসে এসেছে-
لَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ رَجُلٌ مِنْ أُمَّتِي فَيَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ يَوْمًا
অর্থ: আমার উম্মতের কেউ শরাব পান করলে আল্লাহ তা’আলা তার চল্লিশ দিনের নামায কবুল করবেন না। (নাসাঈ: ৫৬৬৪)

আল্লাহর আযাব আসার কারণ:

ইমরান ইবনে হুসাইন রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন:

فِيْ هَذِهِ الْأُمَّةِ خَسْفٌ وَمَسْخٌ وَقَذْفٌ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْـمُسْلِمِيْنَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! وَمَتَى ذَاكَ؟ قَالَ: إِذَا ظَهَرَتِ الْقَيْنَاتُ وَالْـمَعَازِفُ وَشُرِبَتِ الْـخُمُوْرُ

অর্থ: এ উম্মতের মাঝে ভূমি ধস, মানুষের আঙ্গিক অথবা মানসিক বিকৃতি এবং আকাশ থেকে আল্লাহর আযাব নিক্ষিপ্ত হবে। তখন জনৈক মুসলিম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেটা আবার কখন? রাসূল ﷺ বললেন: যখন গায়ক-গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের প্রকাশ্য প্রচলন ঘটবে এবং মদ্য পান করা হবে। (তিরমিযি: ২২১২)

এতদুপরি মদ পানের পাশাপাশি মদ পান করাকে হালাল মনে করা হলে সে জাতির ধ্বংস তো একেবারেই অনিবার্য। আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূল ﷺ বলেছেন:
إِذَا اسْتَحَلَّتْ أُمَّتِيْ خَمْسًا فَعَلَيْهِمُ الدَّمَارُ: إِذَا ظَهَرَ التَّلاَعُنُ، وَشَرِبُوْا الْـخُمُوْرَ، وَلَبِسُوْا الْـحَرِيْرَ، وَاتَّخَذُوْا الْقِيَانَ، وَاكْتَفَى الرِّجَـالُ بِالرِّجَالِ، وَالنِّسَاءُ بِالنِّسَاءِ
অর্থ: যখন আমার উম্মত পাঁচটি বস্তুকে হালাল মনে করবে তখন তাদের ধ্বংস একেবারেই অনিবার্য। আর তা হচ্ছে, একে অপরকে যখন প্রকাশ্যে লা‘নত করবে, মদ্য পান করবে, সিল্কের কাপড় পরিধান করবে, গায়িকাদেরকে সাদরে গ্রহণ করবে, (যৌন ব্যাপারে) পুরুষ পুরুষের জন্য যথেষ্ট এবং মহিলা মহিলার জন্য যথেষ্ট হবে। (বাইহাকী)

ফিরিশতাগণ মদ্যপায়ীর নিকটবর্তী হন না:

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি, থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
ثَلاَثَةٌ لاَ تَقْرَبُهُمُ الْـمَلاَئِكَةُ: الْـجُنُبُ وَالسَّكْرَانُ وَالْـمُتَضَمِّخُ بِالْـخَلُوْقِ.
অর্থ: ফিরিশতারা তিন ধরনের মানুষের নিকটবর্তী হন না। তারা হচ্ছে, জুনুবী ব্যক্তি (যার গোসল ফরয হয়েছে) নেশাগ্রস্ত মদ্যপায়ী এবং খালূক্ব (যাতে জাফ্রানের মিশ্রণ খুবই বেশি) সুগন্ধি মাখা ব্যক্তি। (বুখারী, তাবারানী)

জুয়া:

যে খেলায় হারজিতে টাকা-পয়সার লেনদেন হয়, সেটাই জুয়া৷ মদ হারাম হওয়ার সাথে সাথে জুয়া-বাজিও হারাম করে দেয়া হয়েছে৷ কুরআনে এটাকেও শয়তানি কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে৷

সমাজে প্রচলিত লটারি, হাউজি, ক্রিকেটে বাজি ধরা, চাক্কি ঘোরানো ও রিং নিক্ষেপ থেকে শুরু করে প্রভৃতি নামে নানা ধরনের জুয়ার প্রচলন রয়েছে। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও বসছে জুয়ার আসর। কৃষক, তরুণ, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন আধুনিক নামে জড়িয়ে পড়ছেন মরণনেশা জুয়ায়। এসব আসরে উড়ছে লাখ লাখ টাকা। মাদকের মতোই জুয়ার ছোবল এখন দৃশ্যমান। আমরা এখনই সচেতন না হলে ভয়াবহ ভবিষ্যত আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে৷

সম্মানিত হাযেরীন! মদ-জুয়ার অপকারের আরো কিছু খতিয়ান আপনাদের সামনে উপস্থাপন করব-
মাদকদ্রব্য ও জুয়ার অপকারসমূহ:

১. পরস্পরে শত্রুতা সৃষ্টি হয়৷ অথচ মুসলমান-মুসলমান ভাই-ভাই হয়ে থাকার কথা৷
২. আল্লাহর স্মরণ ও যিকির থেকে বিরত রাখে৷ আল্লাহকে ভুলিয়ে দেয়৷

৩. নামায থেকে গাফেল করে দেয়৷ অথচ নামায হচ্ছে, ঈমান-কুফরের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী৷

৪. মাদকদ্রব্য সেবনের কারণে মানব মেধা সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়ে যায়। মেধাহীন প্রজন্ম গড়ে উঠে৷ ভবিষ্যত প্রজন্ম মেধাশূন্য হয়ে যায়৷

৫. এতদুভয়ের মাধ্যমে সমাজে ব্যাপকহারে খুন-খারাবির বিস্তার ঘটে। সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়৷
৬. ধর্ষণ ও ধর্ষণপরবর্তি হত্যাকাণ্ড বেশিরভাগ মদ পানের মাধ্যমেই ঘটে৷

৭. মদ্যপায়ী ব্যক্তি কখনো কখনো নেশার ঘোরে তার নিজ স্ত্রীকেও তালাক দিয়ে দেয়, যার কারণে নিজের সাজানো-গোছানো পরিবার নিমিষেই তছনছ হয়ে যায়৷

৮. মাদকদ্রব্য সেবন করার অনেকগুলো শারীরিক ক্ষতিও রয়েছে। তম্মধ্যে মরণব্যাধি এইডস, ফুসফুস প্রদাহ, বদহজমী, ব্যথা, অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, অস্থিরতা, খিঁচুনি ইত্যাদি অন্যতম। এ ছাড়াও মাদক সেবনের দরুন আরো অনেক মানসিক ও শারীরীক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। যা বিস্তারিত বলার অবকাশ রাখে না।

৯. মাদকদ্রব্য সেবনের মাধ্যমে হিফাযতকারী ফেরেশতাদেরকে কষ্ট দেওয়া হয়। কারণ, তারা এর দুর্গন্ধে কষ্ট পান, যেমনিভাবে কষ্ট পায় মানুষরা।

১০. মৃত্যুর সময় মাদকসেবীর ঈমানহারা হওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা থাকে।

সম্মানিত হাযেরীন! মদ-জুয়া সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত থেকে বুঝতে পারলাম ইসলামপূর্ব আরবের জাহিলিয়াতের যুগে ব্যাপকভাবে মদ-জুয়ার প্রচলন ছিলো৷ এবং এর প্রভাবে সমাজে নানা অপরাধের সয়লাব ছিলো৷ তখন মদ-জুয়ার আড্ডা বসত৷ জুয়ায় হারতে হারতে একসময় স্ত্রী-সন্তানদেরও জুয়ায় বাজি ধরত৷ বর্তমান সময়ে বহুল আলোচিত ‘ক্যাসিনো’ তখনকার মদ-জুয়ার আড্ডার আধুনিক সংস্করণ৷ আসুন, আমাদের প্রজন্ম, সমাজ, দেশ ও উম্মতকে মদ-জুয়ার এই ভয়াবহ কালো থাবা থেকে রক্ষায় এগিয়ে আসি৷ ক্যাসিনো নামক আধুনিক জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই৷ রুখে দাঁড়াই৷
আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন৷ আমীন৷

লেখক: মুফতি জিয়াউর রহমান
ইমাম ও খতিব: আম্বরখানা জামে মসজিদ, সিলেট৷

Share.

লেখক পরিচিতি

Leave A Reply

Top