যোগ্য রিজাল তৈরি করা হবে সিয়ানাহ ট্রাস্টের প্রধান কাজ – শায়েখ তাহমিদুল মাওলা সাহেব হাফি.

0

গত ৩রা জুন ২০২০ ইং রোজ বুধবার বিকাল ৩টায় সিয়ানাহ ট্রাস্টের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় “দাওয়াহ বিষয়ক অনলাইন প্রশিক্ষণ কর্মশালা”৷ সিয়ানাহ ট্রাস্টের মুহতারাম আমির মুফতি জিয়াউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় সদস্যবৃন্দকে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন বিশিষ্ট দাঈ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও বরেণ্য আলেমে দ্বীন শায়েখ তাহমিদুল মাওলা সাহেব হাফি.

শায়েখ প্রাণবন্ত এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় সিয়ানাহ ট্রাস্টের সদস্যবৃন্দকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

শায়েখ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা আয়াতকে সামনে রেখে আলোচনা করেছেন-
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى
কোন জাতির হিংসা বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন বেইনসাফির প্রতি উদ্বুদ্ধ না করে
(সুরা মায়েদা:৮)

শায়েখ তাঁর মুল আলোচনাকে ৪ টি পয়েন্টে ভাগ করেছিলেন-

১. আলেম/ দাঈদের পরিচয়, বৈশিষ্ট্য।
২. সিয়ানাহ ট্রাস্টের কার্যক্রম বিষয়ক কিছু পরামর্শ।
৩. দাওয়াতের ক্ষেত্রে تسليمي/اثباتي তথা ইতিবাচক পন্থা অবলম্বন করা৷
৪. دفاعي তথা বাতিলের মোকাবেলায় জ্ঞানভিত্তিক প্রতিকারমূলক পন্থা অবলম্বন করা৷

আলেম ও দাঈদের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেন:

হাকিমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত আশরাফ আলী থানবী রহ বলেন:

علم وہ ہے جو گناہ سے زائل ہو جاتے ہیں. (العلم والعلماء)
‘ইলম তাকেই বলে যা গুনাহের কারণে দূর হয়ে যায়।’

আলেম ও দাঈদের জন্য অন্যতম জরুরি শর্ত হল —
(الصحبة المتوارثة)
যে সুহবতের মাধ্যমে নবীজী সা, থেকে চলে আসা আকিদা,ফিকর,ও ফাহমের ওয়ারিশ হওয়া যায়।
এটা নাম কা ওয়াস্তে সুহবত হলে চলবেনা।বরং আল্লাহ ওয়ালা,মাহির উস্তাযের সান্নিধ্যে লম্বা সময় দেয়ার মাধ্যমে ই কেবল হাসিল হয় ।

আলেম ও দাঈদের করণীয় বিষয়ে তিনি মুহতারাম শায়েখ আব্দুল মালিক সাহেব হাফি.র বরাতে বলেন-
প্রত্যেক দায়ী ও আলেম সাহেবের জন্য করণীয় হল —
(ক)
দাঈ ও উলামাদের জীবনী গ্রন্থ বেশি বেশি মুতালাআ করা।
(খ)
নিয়মিত ৪ ধরনের মুতালাআ অব্যাহত রাখতে হবে-
১. ফন্নী/ইলমি মুতালা’আ
২. দারসি মুতালা’আ
৩. ইসলাহী মুতালা’আ
৪. মওসুমি মুতালা’আ

ফন্নী/ইলমি মুতালা :
যেমন — ইলমে ফিকহ,ইলমে হাদিস,ইলমে তাফসির ইত্যাদি।
এই ধরনের মুতালাআ আলিম এবং দাঈ মাত্র সবাইকে সব সময় চালিয়ে যেতে হবে।অধ্যাপনার সিলেবাসে থাক বা নাই থাক।

দারসি মুতালাআ :
যেমন অধ্যাপনার সিলেবাস ভুক্ত কিতাবাদির মুতালাআ পূর্ণ আমানতদারি ও ইতকানের সাথে চালিয়ে যাওয়া। অন্যান্য ব্যস্ততা যেন এখানে কোন বাধা সৃষ্টি করতে না পারে।

মওসুমি মুতালাআ :
এটা হল : যখন যে পরিস্থিতি সামনে আসে,ঐ বিষয়ে শরিয়তের সিদ্ধান্ত গুলো জেনে রাখা।
অনলাইনে দাওয়াতের ক্ষেত্রে কোন মৌসুম নেই। অনলাইনে দাওয়াতের জন্য সব বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করতে হবে। নতুবা ফায়েদার চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি।

ইসলাহি মুতালাআ হল :
দাঈদের আত্মগঠন মূলক মুতালাআ ।

আলেম ও দাঈদেরকে বিশেষ ভাবে মুতালাআর জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছেন তিনি–

১. হাকিমুল উম্মত থানবী রহ.র মাকতুবাত ও মালফুজাত সবগুলো মুতালা’আ করা।
২. বিশেষ ভাবে “ইসলাহী নেসাব” ও আল ইলমু ওয়াল উলামা মুতালা’আ করা৷
৩. শাইখুল ইসলাম তাকী উসমানি সাহেবের মুতালাআ করা।
৪. উম্মাহর ঐক্য পথ ও পন্থা মুতালা’আ করা।
৫. এবং اکابر دیوبند کیا تھے
اسلام اور جدت پسندی
(ইসলাম ও আধুনিকতা) মুতালা’আ করা
৬. সব সময় কিতাব ও রিজাল থেকে أخذ তথা গ্রহণ করার রুচি তৈরি করা৷

– দাওয়াতি কাজের নিয়মনীতি বোঝার জন্য তিনি বিশেষভাবে কয়েকটি কিতাব মুতালা’আ করতে বলেন-

১. আল ইলমু ওয়াল উলামা। থানবী রহ.
২. ইসলাহি নেসাব৷ থানবী রহ.

৩. আল ইনতিবাহাতুল মুফিদাহ৷ থানবী রহ.

৪. ইসলাম ও আমাদের জীবন।
তাকি উসমানি হাফি.

৫. উম্মাহর ঐক্য: পথ ও পন্থা।
শায়েখ আব্দুল মালিক সাহেব
৬.
الانتباهات المفيدة
কিতাবটির ভূমিকায় কয়েকটি উসুল আছে৷ দাওয়াতি কাজের তরিকা বোঝার জন্য বিশেষভাবে এগুলো মুতালাআ করতে বলেছেন৷

– সিয়ানাহ ট্রাস্টের কার্যক্রম সম্পর্কে শায়েখ তাহমিদুল মাওলা সাহেব বলেন–

১. যোগ্য লোক/রিজাল তৈরি করা। এতে ইহ-পরকালে সিয়ানাহ ট্রাস্ট বেশ উপকৃত হবে। খেদমতের পরিধি বিস্তৃত হবে৷
২. ইখলাসের সাথে কাজ করা।
৩. আমাদের কার্যক্রম থেকে যেন বড়দের ও উস্তাযদের মনে কষ্ট না আসে।
৪. ধৈর্যের সাথে কাজ চালিয়ে যাওয়া
৫. কাজের ক্ষেত্রে ত্বরাপ্রবণতা/তাড়াহুড়ো মনোভাব পরিহার করা।
৬. সবরের সঙ্গে কাজের সাথে লেগে থাকা।
৭. অল্প অল্প নির্ভুল ও সঠিক কাজ উপহার দেয়া।
৮. تثبت তথা মজবুতির সাথে কোনো বক্তব্য উপস্থাপন করা৷
৯. সিয়ানাহ ট্রাস্টের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য গুলোর উপর যোগ্য বড় লোকদের থেকে প্রশিক্ষণ নেয়া৷
১০. সিয়ানাহ ট্রাস্টের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের  উপর সারগর্ভ ও সংক্ষিপ্ত বই রচনা করা। এতে সকলেরই ইস্তেফাদা অর্জন হবে।
১১. নিজের মাসলাকের আলেমদের প্রতিপক্ষ না ভেবে নিজের সহযোগি মনে করা৷

– অনলাইনে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে শায়েখ তাহমিদুল মাওলা সাহেব বলেন-

১. যে কোন পরিস্থিতিতে কথা বলার প্রবণতা থেকে বিরত থাকা।
২. জনবল, সমর্থক তৈরি করে তার পর কথা বললে বেশ উপকারী হবে।
৩. বড়দের সুহবতকে সাথে রেখে কাজ করা।
৪. ব্যক্তি ও কিতাবি মুরাজাআত তথা অধ্যয়নের পর কথা বলা।
৫. মতভেদপূর্ণ বিষয়ে নিজেদের মাযহাবের সঠিক বক্তব্য পরিষ্কার করে বোঝা ও নিশ্চিত হয়ে জেনে তারপর কথা বলা।

– শায়েখ তাহমিদুল মাওলা সাহেব লাইভ প্রোগ্রাম বিষয়ক কিছু পরামর্শ দিয়েছেন —

১. লাইভ প্রোগ্রাম হচ্ছে একটি ইমার্জেন্সি বিভাগ।
২. লাইভ প্রোগ্রামে কোন ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেয়া হবে? কোন ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেয়া হবে না? এগুলো আগে ঠিক করে নিতে হবে।
৩. লাইভ প্রোগ্রাম খুব ব্যাপক না হওয়া ভালো।
৪. ভালো হয় যদি প্রশ্ন আগে জমা নিয়ে বাছাই করে উত্তর দেয়া হয়।
৫. উত্তর প্রদানের ভাষা ও উপস্থাপন সুন্দর করা
৬. মতভেদপূর্ণ বিষয়ে উত্তর না দেয়া। বা দিলেও হেকমতের সাথে উত্তর দেয়া। ভিন্নমতকে অশ্রদ্ধা না করা৷
৭. কোন কিছুর সঠিক জানা না থাকলে ভুল না বলা। এ ক্ষেত্রে আরো কয়েকটি হেকমতের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন যেখান অজানা ও জানার কোনটিই না বলে প্রশ্নকর্তাকে পরামর্শ দেয়া নির্দেশনা প্রদান করা।

– সিয়ানাহ ট্রাস্টের উদ্যোগে تسليمي و دفاعي দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে শায়েখ বলেন —

বাতিল ফিরকার মোকাবেলায় দাওয়াতি কার্যক্রম ২ ভাবে পরিচালনা করা যায়। تسليمي و دفاعي ইতিবাচক ও প্রতিকারমূলক৷

উভয় ক্ষেত্রে কিছু করণীয় আছে-

(১) তাসলিমী দাওয়াতের ক্ষেত্রে করণীয়-

ক. যে কোন বিষয়ে تثبت বা দৃঢ়তা থাকা। বিশেষ ভাবে আমাদের মাসলাকি বিষয়ের উপর স্পস্ট ও সাফ ধারণা রাখা। কোন ধরনের অস্পস্টতা না থাকা।

খ. মুরাজা’আ ইলাররিজাল ওয়াল কুতুব তথা কিতাব অধ্যয়ন করা ও বড়দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা৷যুগের মুহাক্কিক আলেমদের সাথে যোগাযোগ রাখা।যেন একটা বিষয়ে পুরোপুরি ইতমেনান হাসিল হয়ে যায়।

গ. لا ادری তথা “আমি জানি না” বাক্যে অভ্যস্ত হওয়া।

(২) দেফায়ী দাওয়াতের ক্ষেত্রে করণীয় —

ক. বাতিলের মোকাবেলায় বিষয়ভিত্তিক ভাগ ভাগ হয়ে প্রস্তুতি ও যোগ্যতা অর্জন করা৷
খ. الرد مع احقاق الحقকোন কিছু খণ্ডনে সত্যটা নিশ্চিত ভাবে প্রমানের পর  মুনাযারা-বিতর্ক এড়িয়ে চলা৷

গ. بصیرة তথা দূরদর্শিতার সঙ্গে সামর্থ নিয়ে কাজ করা৷ সামর্থ না আসা পর্যন্ত মোকাবেলায় লিপ্ত না হওয়া। এভাবে পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে রদ্দে বাতিলের কাজ করা৷

ঘ. বাতিল ফিরকার মোকাবেলায় আকাবির ও আসলাফের মানহাজ ফলো করা।
ঙ. রদ্দে বাতিলের ক্ষেত্রে সবসময় উসুল তথা মুল সুত্রের অনুসন্ধান করা।ভাসা ভাসা রেফারেন্স দিয়ে মোকাবেলায় লিপ্ত না হওয়া।

চ. অগ্রগামী উপযুক্ত বিষয়কে সঠিক সময়ে এগিয়ে রাখা।

= প্রায় দুই ঘণ্টা ব্যাপী প্রাণবন্ত এই প্রশিক্ষণ কর্মশালার শেষ অধিবেশনে শায়েখ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেন।


অনুলিখন: মুফতি আবদুল হামিদ সাকিব
শুরা সদস্য: সিয়ানাহ ট্রাস্ট

Share.

লেখক পরিচিতি

Leave A Reply

Top