দারসে কুরআন ও হাদিস

তাফসিরে সুরা ফাতিহা

শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী হাফি.

পবিত্র কুরআনের শুরুতে রয়েছে সুরায়ে ফাতিহা। এই সুরায়ে ফাতিহার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কয়েকটি জিনিস শিক্ষা দিয়েছেন। দেখুন- আল্লাহ তাআলা সুরায়ে ফাতিহার প্রথম তিন আয়াতে বলেন:

الْحَمْدُ للّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

الرَّحْمـنِ الرَّحِيمِ

مَـالِكِ يَوْمِ الدِّين

অর্থ: ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি এই পৃথিবীর প্রতিপালক। যিনি রহমওয়ালা অতিশয় দয়ালু। যিনি বিচার দিনের মালিক।’

আল্লাহ তাআলা সুরায়ে ফাতিহার এই তিন আয়াতে নিজের প্রশংসা নিজেই করে বান্দাদেরকে তাদের রবের প্রশংসা করা শিখিয়ে দিয়েছেন। আর নিজের প্রশংসা নিজে করা- তা একমাত্র আল্লাহ তাআলারই শান। তাই মানুষের জন্য নিজের প্রশংসা নিজে করা উচিত নয়। মানুষ নিজের প্রশংসা নিজে করলে আত্মতৃপ্তিতে ভোগে নিজের ধ্বংস ডেকে নিয়ে আসবে। আর এটাই হলো এই আয়াতগুলোর শিক্ষা।

এরপর তার পরবর্তী আয়াত দেখুন:

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ

অর্থ: ‘আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।’

এই আয়াতে প্রথমে ইবাদতের কথা এসেছে। এরপর আল্লাহ তাআলার কাছে কোন কিছু চাওয়া বা সাহায্য প্রার্থনার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বান্দাদেরকে ইবাদতের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার কাছে কোন কিছু চাইতে হলে প্রথমে কোন ইবাদত করুন। চাই তা নফল ইবাদত হোক কিংবা ওয়াজিব ইবাদত। এরপরই তাঁর কাছে কোন কিছু চান, সাহায্য প্রার্থনা করুন। ইবাদত ছাড়া আল্লাহ তাআলার কাছে কোন কিছু চাইলে, কোন দুআ করলে, তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বান্দার জন্য উচিত হলো, ইবাদতের মাধ্যমেই তাঁর রবের কাছে কোনকিছু চাওয়া, দুআ করা। আর এটাই আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের মাধ্যমে শিখিয়ে দিয়েছেন।

এরপর পরবর্তী আয়াত দেখুন:

اهدِنَــــا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ
অর্থ: ‘আমাদের সোজা রাস্তায় পরিচালিত করুন।’

আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের সোজা রাস্তার উপর চলার শিক্ষা দিয়েছেন। এবং সোজা রাস্তা কোনটি তাও বলে দিয়েছেন পরবর্তী আয়াতে:
صِرَاطَ الَّذِينَ أَنعَمتَ عَلَيهِمْ

অর্থ: ‘তাঁদের রাস্তার উপর, যারা পুরস্কৃত হয়েছেন।’

অর্থাৎ মুনআম আলাইহিমের রাস্তা- যাদেরকে আল্লাহ তাআলা পুরস্কৃত করেছেন। কাদেরকে আল্লাহ তাআলা পুরস্কৃত করেছেন? কারা পুরস্কারপ্রাপ্ত লোক? তাও আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের অন্য এক আয়াতে বলে দিয়েছেন:

وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَٰئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ ۚ وَحَسُنَ أُولَٰئِكَ رَفِيقًا

অর্থ: ‘আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং রাসূলের হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাঁদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন, সে তাঁদের সঙ্গি হবে, তাঁরা হলেন নবী, সিদ্দীক, শহিদ, সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ, আর তাঁদের সান্নিধ্যই হলো উত্তম।’

নবী, সিদ্দীক, শহিদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ- এই চার শ্রেণির লোক যে রাস্তায় চলেছেন, জীবন-যাপন করেছেন, তাই হলো সোজা রাস্তা। যারা এই চার শ্রেণি লোকের রাস্তার উপর চলবে, তারাই পুরস্কৃত হবে। দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হবে।

এরপর তার পরবর্তী আয়াত দেখু্ন:

غَيرِ المَغضُوبِ عَلَيهِمْ وَلاَ الضَّالِّين

অর্থ: ‘তাদের রাস্তায় আমাদের পরিচালিত করবেন না, যাদের উপর আপনার আযাব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট।’

আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে তাঁর বান্দাদের দুই শ্রেণীর লোকদের রাস্তায় চলা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দিয়েছেন।

এক: যাদের উপর আল্লাহ তাআলা রাগান্বিত ছিলেন এবং যাদের উপর তাঁর আযাব নাযিল করেছেন, তাদের রাস্তা।

দুই: পথভ্রষ্ট লোকদের রাস্তা।

তো এই দুই শ্রেণির লোক কারা?
এই দুই শ্রেণির লোক হলো, ইহুদি আর নাসারা। এই দুই শ্রেণির মানুষের রাস্তায় চলা থেকে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। কিন্তু আফসোসের কথা হলো, আমরা প্রতিদিন পাঁচবার নামাযে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করি, যাতে তিনি আমাদেরকে ইহুদি-নাসাদের পথে পরিচালিত না করেন, কিন্তু আবার ওদিকে তাদের সব কিছুই আমরা গ্রহণ করে নিয়েছি! তাদের সংস্কৃতি, আচার-আখলাক সবই। আমাদের সবকিছুর সাদৃশ্য হলো তাদের সাথে, মুনআম আলাইহিমদের (নেয়ামত প্রাপ্ত চার শ্রেনির লোক) সাথে আমাদের কোন সাদৃশ্য নেই। বড় আফসোসের কথা! আফসোস! আফসোস! (সমাপ্ত)

অনুলিখন: হাসান আনহার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button